ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর দেশটির শত্রুরা এখন হাইব্রিড যুদ্ধ বা বহুমুখী ষড়যন্ত্রের কৌশল বেছে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামিক বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনি। শত্রুদের এই অপতৎপরতা নস্যাৎ করতে তিনি দেশবাসীকে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনির ৩৭তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে সর্বোচ্চ নেতা এই মন্তব্য করেন।
রাজধানী তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত ইমাম খোমেনির মাজারে লাখো ইরানি নাগরিক এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্ত-অনুরাগীরা সমবেত হয়ে এই মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি নতুন করে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
আয়াতুল্লাহ খামেনি তার বার্তায় বলেন, দুষ্ট শত্রু আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সাহসী সন্তানদের কাছে রণক্ষেত্রে এবং জনসমক্ষে শোচনীয় ও অর্থপূর্ণ পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে। এখন তারা হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার বা ছদ্মযুদ্ধের আড়ালে মূলত দুটি লক্ষ্য অর্জনে মনোনিবেশ করেছে: প্রথমত, জনগণের সহনশীলতা ও মনোবল দুর্বল করা; এবং দ্বিতীয়ত, দেশের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভ্রান্তি তৈরি করা।
তিনি আরও যোগ করেন, প্রায় ৮০ বছর আগে ইসরায়েল নামক যে সামরিক আউটপোস্ট বা ঘাঁটিটি বিশ্ব আধিপত্যকামী গোষ্ঠী তৈরি করেছিল, তারা ফোরাত নদীর পূর্বপ্রান্তে-অর্থাৎ তাদের কল্পিত বৃহত্তর ইসরায়েলে’র পূর্ব সীমান্তে-একটি শক্তিশালী, স্বাধীন এবং সক্ষম ইরানের অস্তিত্ব কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। তাই ইরানের অগ্রগতি রুখতে তারা সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সর্বোচ্চ নেতা সতর্ক করে বলেন, শত্রুরা জনগণের মধ্যে সন্দেহ, হতাশা, ভয়, অবিশ্বাস এবং বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তিনি সব ইরানি নাগরিককে দৃঢ়তা এবং অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে এই অপচেষ্টা নস্যাৎ করার আহ্বান জানান। একই সাথে সরকারের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এমন কোনো আচরণ বা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না যা জনগণের মধ্যে হতাশা বা নেতিবাচকতা তৈরি করে, কারণ তা পরোক্ষভাবে শত্রুকে সহায়তা করার শামিল।
ইমাম খোমেনির ব্যক্তিত্বের ওপর আলোকপাত করে আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেন, এই মহান নেতার দেখানো আলোকিত পথ ও লক্ষ্যকে গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি, যা ইরানের ভবিষ্যৎকে পথ দেখাবে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ইমাম খোমেনিকে সরাসরি দেখার সুযোগ পায়নি, এমনকি তার সময়ে বেঁচে থাকা অনেকের পক্ষেও তার ব্যক্তিত্বের গভীরতা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জেগে ওঠাই ছিল ইমাম খোমেনির দর্শনের মূল ভিত্তি। ১৯৬৩ সালের জুনে পশ্চিমা দাসত্ব এবং চরম স্বৈরাচারী শাসনের মধ্যেও যে অবদমিত জাতিকে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন, তা ছিল এক অভূতপূর্ব শক্তির বহিঃপ্রকাশ।
বার্তায় সর্বোচ্চ নেতা সম্প্রতি শহীদ হওয়া সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৬ সালের মার্চের প্রথম দিক থেকে শুরু করে গত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে ইরানের জনগণ তাদের শহীদ নেতার রক্তের মর্যাদা রক্ষা এবং ইসলামি শাসনব্যবস্থা সুরক্ষায় রাজপথে অভূতপূর্ব সংহতি প্রদর্শন করেছে।
আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি জোর দিয়ে বলেন, ইমাম খোমেনি এবং শহীদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দর্শন একই ধারার। ইমাম খোমেনি যেখানে ইরান তথা মুসলিম বিশ্বে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন, শহীদ সর্বোচ্চ নেতা সেই ধারাকে আরও বিকশিত ও বিস্তৃত করেছেন।
আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি পরিশেষে বলেন, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মজলুম ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইরানের ইসলামি, মানবিক এবং জাতীয় দায়িত্ব। আর এই স্বাধীনচেতা ও আপসহীন পরিচয়ের কারণেই শত্রুরা ইরানের ওপর ক্ষিপ্ত।
সূত্র: প্রেস টিভি
ডিবিসি/এসএফএল