পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের নাটকীয় সমাপ্তি ঘটল। বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজ্যের বর্তমান মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়েছেন রাজ্যপাল আর.এন. রবি। এর মাধ্যমে ২০১১ সাল থেকে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা ব্যানার্জির মুখ্যমন্ত্রীত্বের মেয়াদের অবসান হলো।
গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর তৈরি হওয়া নজিরবিহীন সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষিতেই রাজ্যপাল এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন।
গত ৪ মে প্রকাশিত ফলাফলে দুই শতাধিক আসনে জয়লাভ করে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের পথে পা বাড়িয়েছে বিজেপি। তবে প্রথা অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় রাজ্যে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজ রাজ্যপাল স্বয়ং মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেন। এর ফলে নতুন সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত হলো। তবে মুখ্যমন্ত্রীর এমন অনড় অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চরম অস্থিরতা ও সহিংসতার খবর আসছে। পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজিপি) সিদ্ধনাথ গুপ্ত গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ভোট-পরবর্তী সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
ডিজিপি-র দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যজুড়ে ২০০-র বেশি মামলা রুজু হয়েছে। সহিংসতায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ পর্যন্ত ৪৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কলকাতা ও জেলাগুলোতে আসামিদের ধরতে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সহিংসতার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্দরে। পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সচিব চন্দ্রনাথ রথ গতকাল দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে।
বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস পরিকল্পিতভাবে গুপ্তহত্যা চালিয়ে তাদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেছে যে, সহিংসতা ও অশান্তির জন্য বিজেপি সমর্থিত দুষ্কৃতিকারীরাই দায়ী। মূলত ৪ মে রাত থেকেই কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তসহ জেলায় জেলায় তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর ও বোমাবাজির ঘটনা ঘটছে।
১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনের পর এই রাজনৈতিক ক্ষমতা বদল পশ্চিমবঙ্গকে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিকে নতুন সরকারের শপথ নেওয়ার তোড়জোড়, অন্যদিকে রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক হিংসা-সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করে রাজ্যে শান্তি ফেরাতে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস
ডিবিসি/এসএফএল