বিবিধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

রাশিয়ার আকাশযুদ্ধের প্রতীক কামভ কেএ-৫২ ‘এলিগেটর’ অ্যাটাক হেলিকপ্টার!

সিরাজুর রহমান

ডিবিসি নিউজ

৩ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

বর্তমানে রাশিয়ার তৈরি কামভ কেএ-৫২ ‘এলিগেটর’ বিশ্বের অন্যতম আধুনিক এবং ডেডিকেটেড অ্যাটাক হেলিকপ্টার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। তবে, ইউক্রেন যুদ্ধে এই অ্যাটাক হেলিকপ্টারের ব্যাপক মাত্রায় শুট ডাউন বা ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার বিষয়টিও অবশ্য বিশ্ববাসীর নজর এড়ায়নি।

কামভ কেএ-৫২ ‘এলিগেটর’ অ্যাটাক হেলিকপ্টারের শক্তিশালী ফায়ারপাওয়ার, উন্নত প্রযুক্তি এবং কিছু অনন্য নকশাগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এটিকে তুলনা করার ক্ষেত্রে বিশ্বের সেরা গানশিপ যেমন AH-64 Apache অ্যাটাক সাথে সমানভাবে আলোচিত হয়।

 

রাশিয়ার কামভ ডিজাইন ব্যুরো নির্মিত কেএ-৫২ প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে আকাশে উড়ে ১৯৯৬ সালে এবং ১৯৯৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে এর উন্নত সংস্করণ Ka-52M ২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করে।

 

এই অ্যাটাক হেলিকপ্টারের নতুন সংস্করণে উন্নত রাডার ব্যবস্থা, আধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং আরও কার্যকর ডিফেন্স সিস্টেম ওয়েপন্স প্যাকেজ সংযোজন করা হয়েছে। বর্তমানে রাশিয়ার বিমান বাহিনীতে প্রায় শতাধিক কেএ-৫২ এলিগেটর সক্রিয় রয়েছে।

 

বর্তমানে রাশিয়ার পাশাপাশি মিশরও এই হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে এবং আলজেরিয়া ভবিষ্যতে এটি ক্রয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই হেলিকপ্টারের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হলো এর ইজেকশন সিট ব্যবস্থা। বিশ্বের একমাত্র অ্যাটাক হেলিকপ্টার হিসেবে এতে K-37-800 ইজেকশন সিট ব্যবহৃত হয়েছে।

 

আকাশে উড্ডয়নরত অবস্থায় জরুরি প্রয়োজনে প্রথমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এর রোটর ব্লেড বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, এরপর রকেটচালিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পাইলটদের ইজেকশন সিট বা আসন দ্রুত বাইরে নিক্ষিপ্ত হয়। এছাড়া, এর ককপিট টাইটানিয়াম আর্মার এবং বুলেটপ্রুফ গ্লাস দ্বারা সুরক্ষিত করা হয়েছে।

 

এতে ব্যবহৃত FH-01 ‘Arbalet’ রাডার একসঙ্গে প্রায় ২০টি লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে সক্ষম। উন্নত সেন্সর এবং লেজার গাইডেড সিস্টেমের মাধ্যমে এটি দূর থেকে স্থল লক্ষ্যবস্তু নির্ভুলভাবে শনাক্ত ও আক্রমণ করতে পারে। এর সর্বোচ্চ গতি প্রায় ৩০০–৩১০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা, আর এর ক্রুজিং স্পিড হতে পারে প্রায় ২৬০–২৮০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা।

 

কামভ কেএ-৫২ ‘এলিগেটর’ অ্যাটাক হেলিকপ্টারের কমব্যাট রেঞ্জ প্রায় ৪৬০ কিলোমিটার, তবে অতিরিক্ত জ্বালানি ট্যাংক ব্যবহার করলে এটি প্রায় ১,১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে সক্ষম। হেলিকপ্টারটির সার্ভিস সিলিং প্রায় ১৮,০০০ ফুট।

 

কামভ হেলিকপ্টারের বিশেষ কো-অ্যাক্সিয়াল রোটর প্রযুক্তি এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এই নকশার কারণে এটি পাশ দিয়ে প্রায় ৮০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা এবং পিছনের দিকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগে উড়তে পারে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে বড় সুবিধা দেয়।

 

অস্ত্রশস্ত্রের দিক থেকে কেএ-৫২ বেশ শক্তিশালী। এতে রয়েছে ৩০ মিমি 2A42 অটো-ক্যানন, Vikhr এবং Ataka ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মিসাইল, পাশাপাশি Igla-V এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল। উন্নত লেজার গাইডেড সিস্টেমের মাধ্যমে চলমান লক্ষ্যবস্তুকেও নির্ভুলভাবে আঘাত করতে পারে।

 

তবে কাগজে-কলমে অতি উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও কিন্তু সামনে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আনুমানিক ৫৫-৬০টির বেশি কেএ-৫২ হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে, যার বেশিরভাগই পোর্টেবল (MANPADS) এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দ্বারা ভূপাতিত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

সবশেষ বলা যায়, একবিংশ শতাব্দীর এই ডেডিকেটেড কমব্যাট হেলিকপ্টার হিসেবে কামভ কেএ-৫২ এলিগেটরকে একদিকে রাশিয়ার আকাশ সামরিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীক বলা হলেও, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র এর কার্যকারিতা এবং সীমাবদ্ধতা উভয় দিকই ইউক্রেন যুদ্ধে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
 

লেখক: সিরাজুর রহমান, শিক্ষক ও লেখক

 

ডিবিসি/আরএসএল

আরও পড়ুন