রাশিয়া গত ১২ মে তাদের কৌশলগত অস্ত্রাগারের সবচেয়ে শক্তিশালী 'RS-28 (সারমাত)' ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইলের (আইসিবিএম) সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। রাশিয়ার দাবি, এই মিসাইলের রেঞ্জ বা পাল্লা হবে প্রায় ৩৫ হাজার কিলোমিটার। এটিকে মূলত সোভিয়েত আমলের পুরোনো প্রায় ৪০টি 'RS-36 (ভয়েভোদা)' ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইলের উত্তরসূরি হিসেবে সার্ভিসে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, ওজন ও আকারের দিক থেকে এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিশাল আকৃতির মিসাইল। প্রায় ৩৫ মিটার দীর্ঘ এই কৌশলগত ব্যালিস্টিক মিসাইলের ওজন প্রায় ২০৮ টন। এটিকে ভূমিভিত্তিক 'সাইলো বেস' থেকে উৎক্ষেপণের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন ও তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি এখনও চূড়ান্তভাবে সার্ভিসে আসেনি।
রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, RS-28 (সারমাত) ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইলের পে-লোড সক্ষমতা প্রায় ১০ টন। এটি একসঙ্গে ১০টি বড় অথবা ১৫-১৬টি ছোট আকারের 'মাল্টিপল ইন্ডিপেন্ডেন্টলি টার্গেটেবল রিয়েন্ট্রি ভেহিকল' (MIRV) নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। তাছাড়া এতে উচ্চ প্রযুক্তির হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেলও (HGV) ব্যবহার করা যায়।
তবে এই ধ্বংসাত্মক মিসাইলের রেঞ্জ এবং ওয়ারহেড সক্ষমতা নিয়ে রাশিয়া যা-ই প্রচার করুক না কেন, বাস্তবে এই দাবি প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেকটাই ত্রুটিপূর্ণ কিংবা প্রোপাগান্ডামূলক হতে পারে। কারণ, গত ২০২৪-২৫ সালের দিকে এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছিল বলে পশ্চিমা গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, গত ২০২২ সালের দিকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই মিসাইলের রেঞ্জ ১৫-১৮ হাজার কিলোমিটার দাবি করা হলেও, চলতি ২০২৬ সালের মে মাসে এসে হঠাৎ করেই ৩৫ হাজার কিলোমিটার রেঞ্জের কথা বলা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে পৃথিবীর পরিধি প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার হওয়ায়, ১৮ হাজার কিলোমিটার রেঞ্জ দিয়েই পৃথিবীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব।
রাশিয়া দাবি করেছে, ২০২৬ সালের মে মাসে এই কৌশলগত মিসাইলের সর্বশেষ পরীক্ষাটি সফল হয়েছে। এর ফলে চলতি ২০২৬ সালের শেষের দিকে মিসাইলটির প্রথম ইউনিট রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক মিসাইল ফোর্সেসের অধীনে মোতায়েন করা হতে পারে। যদিও এটি আপাতত অনুমানের ওপরই সীমাবদ্ধ।
রাশিয়ার হাতে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইলের বিশাল মজুত থাকলেও, এটিকে এখন আর অতিমাত্রায় ভয়ংকর কিংবা 'গেম চেঞ্জার' অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে 'সেকেন্ড নিউক্লিয়ার স্ট্রাইক' সক্ষমতা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে এই অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়া কখনোই একতরফাভাবে কৌশলগত সুবিধা আদায় করতে পারবে না।
পরিশেষে বলা যায়, বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা এবং সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ার RS-28 (সারমাত) ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রযুক্তিগত দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এর রেঞ্জ ও ধ্বংসক্ষমতার কিছু দাবি অতিরঞ্জিত প্রচারণা কিংবা পশ্চিমা বিশ্বকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার জন্য রাশিয়ার একটি কৌশলও হতে পারে।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, রয়টার্স, আরটি (RT)
সিরাজুর রহমান
শিক্ষক ও লেখক
ডিবিসি/এসএফএল