বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ কিংবা ষাটের দশকের দিকে পশ্চিমা মিডিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে উপহাস করে নিয়মিত প্রচ্ছদ ছাপানো হতো। অথচ আজ সেই একই রেড জায়ান্ট চীন এক সুবিশাল অর্থনীতির দেশে হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বর্তমানে এক আমেরিকা ব্যতীত সমগ্র ইউরোপের দেশগুলোর জিডিপি কিংবা ফরেক্স রিজার্ভ একত্র করলেও এখন আর চীনের সমান হবে না।
চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দা মুখে চীনের সার্বিক অর্থনীতি কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পরলেও বিগত এক দশক থেকে সারা বিশ্বে একক দেশ হিসেবে শীর্ষ স্থানীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তুলেছে। গত ৭ই জুলাই চীনের ফরেন এক্সচেঞ্জের স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৩০শে জুনের হিসেব অনুযায়ী চীনের ফরেক্স রিজার্ভে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩.২২২৪ ট্রিলিয়ন ডলার।
যদিও চীনের এই রিজার্ভ মে মাস অপেক্ষা ৯.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ০.৩% কম ছিল। যেখানে গত মে মাস শেষে চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩.২৩২ ট্রিলিয়ন ডলার। এদিকে দেশটির হাতে গত জুন মাসের শেষে নিট সোনার মজুত ছিল ৭.২৮ কোটি আউন্স। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১৬৯.৭ বিলিয়ন দলার। আর এ থেকে দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা ঠিক কতটা টেকসই এবং শক্তিশালী তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
মূলত বৈশ্বিক মহামন্দার পাশাপাশি আমেরিকার সাথে চলমান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বের কারণে চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য কিন্তু গত ২০২৩ সালে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশটির রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ কাস্টমস কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত ২০২৩ সালের বারো মাসে চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ তার আগের বছর অপেক্ষা প্রায় ৫% হ্রাস পেয়ে ৫.৯৪ ট্রিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। যেখানে দেশটি গত ২০২২ সালে মোট ৬.০৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য করেছিল।
চীন গত ২০২৩ সালের ১২ মাসে সারা বিশ্বে মোট পণ্য ও সেবা রপ্তানি করে ৩.৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং একই সময়ে সারা বিশ্ব থেকে ২.৫৬ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা আমদানি করে। যা আগের ২০২২ সাল অপেক্ষা রপ্তানি ৪.৬% এবং আমদানি ৫.৫% কম ছিল। তবে চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ কাস্টমসের দেয়া তথ্যমতে, চলতি ২০২৪ সালের শুধু মে মাসে দেশটি সারা বিশ্বে মোট পণ্য ও সেবা রপ্তানি করে ৩০২.৩৫ বিলিয়ন ডলার এবং একই সময় পণ্য ও সেবা আমদানি করে ২১৯.৭৩ বিলিয়ন ডলার।
উইকিপিডিয়ার দেয়া তথ্যমতে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে চলতি ২০২৪ সালের চীনের নমিনাল জিডিপির আকার হচ্ছে ১৮.৫৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার। যেখানে বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি আমেরিকার জিডিপির আকার ২৮.৭৮ ট্রিলিয়ন ডলার। আর জিডিপি আকারের বিবেচনায় আমেরিকা অপেক্ষা চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেকটাই কম হলেও বাস্তবে বৈদেশিক ঋণ ও দেনার স্থিতির বিচারে চীন কিন্তু খুবই সুবিধাজনক স্থানেও রয়েছে।
চলতি ২০২৪ সালের মে মাসের হিসেব অনুযায়ী আমেরিকার মোট ঋণ ও দেনার স্থিতির পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে ৩৪.৫৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমাকে স্পর্শ করে। অন্যদিকে গত ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস শেষে চীনের নিজস্ব বৈদেশিক ঋণ ও দেনার স্থিতির পরিমাণ ছিল কিনা ২.৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে চলতি ২০২৪ সালের হিসেব অনুযায়ী বৈদেশিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে চীন সারা বিশ্বের প্রায় অর্ধ শতাধিক বা তার অধিক সংখ্যক দেশের কাছে প্রাপ্য বৈদেশিক ঋণ দেনার স্থিতির পরিমাণ হয়ত প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার বা তার বেশি হতে পারে।
তবে পশ্চিমা মিডিয়ার দেয়া তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির বৈদেশিক ঋণ ও বিনিয়োগ নীতি স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সমস্যার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এই দেশগুলোকে দীর্ঘ মেয়াদে একরকম অদৃশ্য বৈদেশিক ঋণের ফাঁদে আটকে ফেলেছে বলে মনে করে পশ্চিমা বিশ্ব। যদিও পশ্চিমাদের এহেন সমালোচনাকে অনেকটাই একতরফা বা ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে করে চীন। তথ্যসূত্র: ভিজুয়্যাল ক্যাপিটালিস্ট, স্টাটিস্টা, সিএনএন, রয়টার্স, আনাদুলু ও উইকিপিডিয়া।
ডিবিসি/এএনটি