খেলাধুলা, ফুটবল

রোগাটে শরীর থেকে ‘অতিমানবীয়’ ফিটনেস: হালান্ডের বিস্ময়কর যাত্রা

ডেস্ক নিউজ

ডিবিসি নিউজ

২ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

আরলিং হালান্ডের শৈশবের কথা মনে করে হাসিমুখে তার সাবেক কোচ এস্পেন উন্ডহেইম বলেন, ছোটবেলায় এই তারকা স্ট্রাইকার আজকের মতো এত সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন না। তবে সেই ‘রোগা’ ছেলেটির ভেতরেই তিনি ফুটবলের প্রতি তীব্র আবেগ ও সম্ভাবনা দেখেছিলেন।

নরওয়ের দক্ষিণাঞ্চলের ফুটবল ক্লাব ব্রাইন এফকে-তে তাদের প্রথম দেখা হয়। উন্ডহেইম এখনও সেই ক্লাবের যুব কোচ হিসেবে কাজ করছেন। তখন ৮ বছর বয়সী হালান্ড ছিলেন খেলাটি শিখতে আগ্রহী হাজার হাজার স্থানীয় শিশুর মধ্যে একজন। উন্ডহেইম জানান, হালান্ডের বিশেষত্ব ছিল সে সবসময় গোল করার উপায় খুঁজত এবং গোল করার পর পুরো মাঠ দৌড়ে উদযাপন করত। ছোটবেলাতেই তার মধ্যে গোল করার এক দারুণ প্রবৃত্তি ছিল।

 

সেই সময়ের সম্ভাবনা আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে, হালান্ড এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। ম্যানচেস্টার সিটিতে কাটানো চার মৌসুমে তিনি তিনবার প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। লিগে দ্রুততম খেলোয়াড় হিসেবে মাত্র ১১১ ম্যাচে ১০০ গোলের মাইলফলকও ছুঁয়েছেন তিনি। ২৫ বছর বয়সী এই তারকা ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো নরওয়েকে এবারের বিশ্বকাপে নিয়ে গেছেন এবং বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন। শেষ ষোলোতে ব্রাজিলের বিপক্ষে চমকপ্রদ জয়ে জোড়া গোল করার পর টুর্নামেন্টে তার গোলসংখ্যা এখন সাত, যা কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির সমান।

 

তবে তারকাখ্যাতি ও কোটি টাকার চুক্তির আগে হালান্ড তার ছোট্ট নরওয়েজিয়ান শহরের অন্য সাধারণ শিশুদের মতোই ছিলেন। উন্ডহেইম স্মরণ করেন, হালান্ড ও তার বন্ধুরা শহরের ইনডোর ফুটবল মাঠে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাতেন। খাওয়া, ঘুম বা স্কুল বাদে বাকি সময় তিনি সেখানে নিজের চেয়ে এক বছরের বড় ছেলেদের সাথে খেলতেন। এরপর উন্ডহেইমের অধীনে তিনি সপ্তাহে তিন দিন অনুশীলন শুরু করেন এবং কয়েক বছর পর ব্রাইনের যুব দলে সুযোগ পান। শুরুর দিকে তিনি শুধু বাঁ পায়ে খেলতেন, তাই ডান পায়ে উন্নতি করতে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। তবে তার আসল শক্তি ছিল মানসিকতায়। বল না পেলে সতীর্থদের ওপর এবং গোল করতে ব্যর্থ হলে নিজের ওপর খুব রেগে যেতেন তিনি।

 

সেই জেদ এখনও তার খেলার একটি বড় অংশ। এমনকি এবার ক্লাবের হয়ে এফএ কাপ জেতার পরও শেষ আক্রমণে সতীর্থ বল পাস না দেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তবে হালান্ড জানেন কীভাবে এই জেদকে দলের উপকারে ব্যবহার করতে হয়। সাবেক কোচের মতে, তার এই মানসিকতার পেছনে দুটি বিষয় কাজ করেছে, একটি হলো ব্রাইনের কৃষিভিত্তিক কঠোর পরিবেশ এবং অন্যটি তার বাবা ও সাবেক ম্যানচেস্টার সিটি খেলোয়াড় আলফ-ইঙ্গে হালান্ডের সঠিক নির্দেশনা। বিখ্যাত বাবার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তার ওপর কোনো বাড়তি চাপ ছিল না। উন্ডহেইমের মতে, সে ছিল সাধারণ এক মজার ছেলে এবং এখনও সে তেমনই আছে।

 

বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার ফুটবল ক্যারিয়ারও সিরিয়াস হতে থাকে। ১৫ বছর বয়সেই তিনি ব্রাইনের অনূর্ধ্ব-১৮ দলে খেলেন এবং অন্যান্য ক্লাবের নজর কাড়েন। ২০১৭ সালে তিনি দেশের অন্যতম বড় ক্লাব মোল্ডেতে যোগ দেন। সেখানে দারুণ পারফরম্যান্স তাকে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে নিয়ে আসে। সেই সময়ে জাতীয় দলের কোচদেরও নজরে পড়েন তিনি। নরওয়ের সাবেক যুব কোচ লেইফ গুনার স্মেরুড জানান, শুরুতে হালান্ডের মধ্যে সহজাত প্রতিভার চেয়ে ফুটবলের প্রতি তীব্র আবেগটাই বেশি চোখে পড়েছিল।

 

শারীরিক দিক থেকে হালান্ড কিছুটা দেরিতে বিকশিত হয়েছেন। ছোটবেলায় অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করার জন্য তাকে বুদ্ধিমত্তা, পজিশনিং এবং টেকনিকের ওপর নির্ভর করতে হতো। কৈশোরে তার শারীরিক গঠন মজবুত হতে শুরু করে, যা এখন তাকে তার বিশাল আকার ও গতির সাহায্যে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করতে সাহায্য করে। স্মেরুড মনে করেন, ছোটবেলায় শারীরিক সুবিধা না থাকাটা হালান্ডের জন্য আশীর্বাদ হয়েছিল, কারণ এর ফলে তাকে ফুটবলের অন্যান্য কৌশলগুলো ভালোভাবে শিখতে হয়েছিল।

বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে খেলার পর ২০১৯ সালের অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে ৯ গোল করে (সবকটি হন্ডুরাসের বিপক্ষে এক ম্যাচে) তিনি সবার নজর কাড়েন। এরপর অস্ট্রিয়ার ক্লাব আরবি সালজবুর্গে যোগ দিয়ে ২২ ম্যাচে ২৮ গোল করেন তিনি। এই দুর্দান্ত ফর্ম তাকে ২ কোটি ডলারের বেশি চুক্তিতে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে নিয়ে যায়। সেখানে নিজেকে আরও শাণিত করে ২০২২ সালে তিনি ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন।

 

সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছালেও হালান্ড এখনও আগের মতোই আছেন বলে মনে করেন স্মেরুড। তার মতে, হালান্ড একজন ভালো সতীর্থ এবং ভালো মানুষ। নিজের শহরকে তিনি ভালোবাসেন এবং সেখানকার মানুষও তাকে নিয়ে গর্বিত। এই বিশ্বকাপে তিনি আরও বড় তারকা হয়ে উঠেছেন। তবুও ব্রাইনে তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের বিপক্ষে নরওয়ের ম্যাচটি দেখার জন্য হালান্ডের সেই পুরনো ইনডোর মাঠে প্রায় ১,০০০ তরুণ খেলোয়াড় জড়ো হয়েছিল। ম্যাচটিতে হালান্ড না খেললেও নতুন প্রজন্মের ওপর তার প্রভাব স্পষ্ট। উন্ডহেইম জানান, তাদের ইনডোর মাঠে হালান্ডের একটি ৫০ মিটার লম্বা এবং ১৫ মিটার চওড়া ছবি আঁকা আছে, যা প্রমাণ করে সে সেখানে কতটা জনপ্রিয়।
 

সূত্র: সিএনএন

 

ডিবিসি/এফএইচআর

আরও পড়ুন