বাংলাদেশ

শত বছরের বিচ্ছিন্নতার অবসান, জাতীয় মহাসড়কে যুক্ত হচ্ছে ভোলা

বাসস

ডিবিসি নিউজ

৫ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

শান্ত তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ে দ্বীপের রানী ভোলা। ওপারে কীর্তনখোলার তীরে দাঁড়িয়ে প্রাচ্যের ভেনিসখ্যাত বরিশাল। ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হলেও দুই জনপদের মাঝখানের বিশাল জলরাশি যুগের পর যুগ ভোলাবাসীর যোগাযোগে বড় বাধা হয়ে আছে।

বরিশাল কিংবা দেশের অন্য অঞ্চলে সড়কপথে যেতে হলে ভোলার মানুষকে এখনো নির্ভর করতে হয় ফেরি, লঞ্চ, ট্রলার কিংবা স্পিডবোটের ওপর। ফেরিঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষা, যানজট, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং বৈরী আবহাওয়ায় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া এখানকার মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগ। কয়েক কিলোমিটারের নদীপথই কখনো কখনো হয়ে ওঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টার অনিশ্চিত যাত্রা।

 

দীর্ঘদিনের সেই ভোগান্তি কাটিয়ে এবার দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলাকে জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভোলা-মেহেন্দীগঞ্জ-হিজলা-রহমতপুর রুটে নতুন মহাসড়ক নির্মাণের মাধ্যমে দ্বীপ জেলাটিকে সরাসরি দেশের মূল সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালের এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে ভোলাকে জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়।

 

সর্বশেষ ২২ আগস্ট বরিশালের রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে মহাসড়ক নির্মাণের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ জেলাটিকে জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় আনার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

স্থানীয়রা বলছেন, এ মহাসড়ক বাস্তবায়িত হলে শুধু ভোলা নয়, মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা, মুলাদী ও রহমতপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য, শিল্প, পর্যটন ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে।

 

মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর, ইলিশা ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদী এবং বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত ভোলার যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান মাধ্যম দীর্ঘদিন ধরেই নৌপথ। কিন্তু ঝড়, ঘন কুয়াশা কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে কার্যত দেশের অন্যান্য এলাকার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে জেলার মানুষ।

 

স্বাধীনতার ৫৬ বছর পর ভোলাকে সরাসরি মূল ভূখণ্ডের সড়ক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত করার এ উদ্যোগকে তাই ঐতিহাসিক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

 

খনিজ গ্যাস, রুপালি ইলিশ, ধান, সুপারি, তরমুজ, ক্যাপসিকামসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যে সমৃদ্ধ ভোলা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও সরাসরি সড়ক যোগাযোগের অভাবে এখানকার উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের বাড়তি পরিবহন ব্যয় ও সময়ক্ষেপণের মুখে পড়তে হয়।

 

ভোলা পৌরসভার অফিসারপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল আহাদ খান ও বাবুল মিয়া বাসসকে বলেন, জরুরি রোগীকে ঢাকা বা বরিশালে নিতে হলেও এতদিন নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

 

তারা বলেন, ‘অধিক সময় লাগা এবং ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের কারণে কখনো কখনো পথেই রোগীর মৃত্যু ঘটে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে যেন ভৌগোলিক কারাগারে বন্দি ছিলাম। ভোলা-মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে মহাসড়ক নির্মাণ হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।’

 

ভোলা চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন খান বলেন, গ্যাস, কৃষি, ইলিশ ও পর্যটন সব মিলিয়ে ভোলা অপার সম্ভাবনার জেলা।

 

তিনি বলেন, ‘সড়কপথে ভোলাকে বরিশাল ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ইলিশ, ক্যাপসিকাম, তরমুজসহ বিভিন্ন পণ্য দ্রুত রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে প্রান্তিক কৃষক ও খামারিরা তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন।’

 

তবে মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবিও পুনরায় জোরালো করেছেন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

‘আমরা ভোলাবাসী’ সংগঠনের সদস্য সচিব মীর মোশারেফ অমি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবিতে আন্দোলন করছি। মহাসড়ক নির্মাণের সঙ্গে সেতুর বিষয়টি যেন সাংঘর্ষিক না হয়। ভোলার সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবিকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।’

 

ভোলা প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট নজরুল হক অনু বলেন, আধুনিক যুগেও ভোলা দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ জেলাবাসীর জন্য অত্যন্ত আনন্দের।

 

তবে লাহারহাট-বরিশাল হয়ে সেতুর মাধ্যমে ভোলাকে সরাসরি সারাদেশের সঙ্গে যুক্ত করাও এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন তিনি।

 

ভোলা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণায় জেলার মানুষের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে।

 

তিনি বলেন, ‘এই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে ভোলার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। গ্যাসের যথাযথ ব্যবহার বাড়বে, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন হবে এবং এর সুফল শুধু ভোলা নয়, পুরো বাংলাদেশ পাবে। দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়বে।’

 

ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, নদীবেষ্টিত ভোলার সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ স্থাপন এবং ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবি।

 

তিনি জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে ভোলাকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ দ্বীপ জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।

 

ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ভোলাকে জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেরই অংশ।

 

তিনি বলেন, ‘মহাসড়কে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে যেমন অর্থনীতির প্রসার ঘটবে, তেমনি দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার গ্লানি থেকে মুক্ত হবে ভোলার প্রায় ২২ লাখ মানুষ।’

 

দক্ষিণাঞ্চলকে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্যেও সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।

 

সড়ক ও জনপথ বিভাগের ভোলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম জানান, রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে নতুন করে প্রায় সাড়ে ২১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

তিনি বলেন, ‘কনসালট্যান্ট নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। এরপর দ্রুত নির্মাণকাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। সড়কটি নির্মিত হলে ঢাকার সঙ্গে ভোলার দূরত্ব ও যাতায়াত সময় কমে আসবে এবং জেলার অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’

 

সড়ক যোগাযোগ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়ন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রথমবারের মতো ভোলা জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

 

দীর্ঘদিন নদীনির্ভর যোগাযোগে অভ্যস্ত ভোলাবাসীর কাছে তাই এ উদ্যোগ কেবল একটি নতুন সড়ক নির্মাণ নয়; এটি শত বছরের বিচ্ছিন্নতা, অপেক্ষা ও ভোগান্তি পেরিয়ে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে নতুন সেতুবন্ধনের স্বপ্ন।

 

ডিবিসি/এমএনকে

আরও পড়ুন