রাজনীতির কঠিন সময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন সামনের সারিতে। রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করেছেন। জীবনের বড় একটি অংশ দল ও রাজনীতির পেছনে ব্যয় করা শরীয়তপুরের সাবেক যুবদল নেতা মনির হোসেন মাঝি অবশেষে দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
তার মৃত্যুতে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন তার দুই সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার হাজরাসার গ্রামে কৃতিনাশা নদীর পাড়ে এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম মনির হোসেন মাঝির। স্কুলজীবনেই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। দায়িত্ব পালন করেন ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবেও। নব্বইয়ের দশকে কলেজে অধ্যয়নকালে সক্রিয় রাজনীতিতে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হন। পরবর্তী সময়ে শরীয়তপুর জেলা যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন মনির মাঝি। রাজনৈতিক কারণে একাধিকবার কারাবরণ ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে এমনটাই জানিয়েছেন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা।
স্বাভাবিকভাবেই চলছিল তার সংসার ও রাজনৈতিক জীবন। কিন্তু ২০২৩ সালে নেমে আসে বড় বিপর্যয়। ফরিদপুরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে অবস্থানকালে খবর পান, তার স্ত্রী স্ট্রোক করেছেন। পরে তার স্ত্রী মারা যান। জীবনসঙ্গীকে হারানোর সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরের বছর আরও বড় দুঃসংবাদ আসে।
২০২৪ সালে চিকিৎসকেরা জানান, মনির হোসেন মাঝি ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত। এরপর শুরু হয় ক্যানসারের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে তার চিকিৎসায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারের জমানো অর্থ একপর্যায়ে পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। এরপর বিক্রি করতে হয় বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বল কৃষিজমিও।
তবু অর্থের সংকট কাটেনি। ক্যানসারের ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। পরিবারের দাবি, অর্থাভাবে জীবনের শেষ দুই মাস প্রয়োজনীয় ওষুধও নিয়মিত কিনতে পারেননি মনির মাঝি। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ লড়াই শেষে ক্যানসারের কাছে হার মানেন তিনি।
তার মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তায় পড়েছে দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ। মনির মাঝির বড় ছেলে তাজমুল বর্তমানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। ছোট ছেলে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে তাদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখা এবং সংসারের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করা নিয়েও দেখা দিয়েছে গভীর সংকট।
স্থানীয় যুবদল নেতা রুহুল আমিন ও সালাম মাঝি বলেন, দেশের ও দলের কঠিন সময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে মনির মাঝি সবসময় সামনের সারিতে ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের প্রতিকূল সময়ে তিনি বহু ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
তারা বলেন, জীবনের বড় অংশ রাজনীতি ও দলের জন্য ব্যয় করা একজন তৃণমূল নেতা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে না পেরে এভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে চলে যাবেন এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
মনির হোসেন মাঝির মৃত্যুতে শরীয়তপুরের স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোক। রাজপথে দীর্ঘদিনের পরিচিত একটি মুখের জীবনপ্রদীপ নিভে গেলেও তার চলে যাওয়ার সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা এখন বহন করতে হচ্ছে পরিবারকে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে প্রায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া পরিবারটির সামনে এখন সন্তানদের পড়াশোনা, সংসারের ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তা সবকিছুই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিবিসি/এমএনকে