বিবিধ

শিক্ষা ও গবেষণায় টেকসই বিনিয়োগে মুসলিম বিশ্বের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

সিরাজুর রহমান

ডিবিসি নিউজ

২ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন, প্রযুক্তিগত আধিপত্য এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে শিক্ষা ও গবেষণায় পরিকল্পিত ও টেকসই বিনিয়োগ। এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোর নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে শিক্ষা ও গবেষণায় পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

এই বাস্তবতা গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করে বিশ্বের প্রভাবশালী ও উন্নত দেশগুলো কয়েক দশক আগে থেকেই তাদের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও কর্মপরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে রোবটিক্স, মহাকাশ বিজ্ঞান, ন্যানো টেকনোলজি, এভিয়েশন, অটোমোবাইলস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে (মেডিসিন টেকনোলজি) ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছে।


মুসলিম বিশ্বের মধ্যে ইরান, মালয়েশিয়া ও তুরস্কের মতো কিছু দেশ তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেলেও সামগ্রিকভাবে অধিকাংশ মুসলিম দেশ বিজ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে হতাশাজনকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। এই পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণগুলো হলো- শিক্ষা ও গবেষণায় বাজেটের বৈষম্য, মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার অভাব, গবেষণায় সীমিত সুযোগ এবং মেধাবীদের বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা (ব্রেইন ড্রেইন)।


তাই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও নিজস্ব প্রযুক্তিগত উন্নয়নে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে টেকসই পরিকল্পনার ভিত্তিতে বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে (R&D) পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।


বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বিনিয়োগের দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে। ইউএস ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের (USNSF) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে R&D খাতে প্রায় ৯৩৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে, সিজিটিএন-এর (CGTN) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন R&D খাতে প্রায় ৫৫০–৫৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা দেশটির জিডিপির প্রায় ২.৭–২.৮ শতাংশ।


উভয় দেশই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের উন্নত শিক্ষা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরমাণু প্রযুক্তি, অটোমোবাইল, এভিয়েশন, সেমিকন্ডাক্টর, মহাকাশ, ন্যানো টেকনোলজি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্বালানি খাতের আধুনিকায়নে বিপুল বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া অন্যান্য উন্নত ও প্রভাবশালী দেশগুলোও তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত উন্নয়নে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।


দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান শক্তি ভারত ও রাশিয়ার R&D ব্যয় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় যথেষ্ট কম হলেও উভয় দেশের গবেষণা কাঠামো নিজস্ব শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এএনআই-এর (ANI) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারতে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে বার্ষিক R&D ব্যয় ছিল প্রায় ২.৪৫ লাখ কোটি রুপি (প্রায় ২৫.৬১ বিলিয়ন ডলার), যা দেশটির জিডিপির প্রায় ০.৮৪ শতাংশ।


অন্যদিকে, ইন্টারফ্যাক্স-এর (Interfax) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়ার ফেডারেল বাজেট থেকে বেসামরিক বিজ্ঞান ও গবেষণায় বরাদ্দ ছিল প্রায় ৭৯২১ বিলিয়ন রুবল বা ৯.৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫.৩ শতাংশ বেশি। তবে রাশিয়ার সামগ্রিক R&D ব্যয় জিডিপির ১ শতাংশের নিচেই সীমাবদ্ধ রয়েছে এবং এর অধিকাংশই মহাকাশ, জ্বালানি, পরমাণু প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, প্রকৌশল ও মৌলিক বিজ্ঞানে কেন্দ্রীভূত।


মুসলিম বিশ্বের মধ্যে তুরস্ক, ইরান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তিগত গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তুর্কি টুডে-এর (Turkish Today) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তুরস্কের R&D খাতে ব্যয় ছিল প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির প্রায় ১.৪ শতাংশ। অন্যদিকে, সৌদি আরবের সরকারি সংস্থা গ্যাস্ট্যাট-এর (GASTAT) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির R&D খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭.৮৭ বিলিয়ন ডলার।


তবে সার্বিক বিবেচনায় মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখনো পর্যন্ত একটি টেকসই ও পরিকল্পিত গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেনি। তাই সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, পরমাণু প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এভিয়েশন, মেরিন টেকনোলজি, জ্বালানি ও উন্নত উৎপাদনমুখী প্রযুক্তির মতো খাতে মুসলিম দেশগুলোকে নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং পারস্পরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।


এখানে উল্লেখ্য যে, শুধু R&D খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না, বরং এর সঙ্গে উচ্চমানের শিক্ষাব্যবস্থা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পখাতের নিবিড় ও কার্যকর সম্পর্ক স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বা প্রোটোটাইপ যদি শিল্পখাতের উৎপাদন কেন্দ্রে গিয়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হয়, তবেই কেবল সেই গবেষণা ও পরিশ্রম সার্থক হতে পারে।


বিশেষ করে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগারে উদ্ভাবিত জ্ঞান ও প্রযুক্তি যদি শিল্পে প্রয়োগের সুযোগ পায়, তবে তা দেশের শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে, শিল্পের বাস্তব সমস্যা ও চাহিদা যখন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন গবেষণার ব্যবহারিক মূল্য ও কার্যকারিতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আর যার সুফল দেশ ও জাতি দীর্ঘ মেয়াদে উপভোগ করতে পারে।


প্রসঙ্গত, মধ্যযুগের মুসলিম রেনেসাঁর সময় বিজ্ঞানচর্চায় বৈশ্বিক পর্যায়ে নেতৃত্বের আসনে ছিল মুসলিম জাতি। বিশেষ করে বাগদাদ, কর্ডোবা ও কায়রো ছিল জ্ঞানবিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু আজ প্রায় ২ বিলিয়ন জনসংখ্যার এই বিশাল আকারের মুসলিম জনগোষ্ঠী বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে উন্নত বিশ্বের তুলনায় খুবই নগণ্য পর্যায়ে রয়ে গেছে, যা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে আমাদের এই ব্যবধানকে আরও প্রকট করে তুলেছে।


তাই পরিশেষে বলা যায়, একটি শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়তে শিক্ষা, গবেষণা ও শিল্পকে আলাদা তিনটি ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত উন্নয়নের হাতিয়ার এবং উদ্ভাবন ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং শিক্ষাগবেষণায় (R&D) কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।


তথ্যসূত্র: Wikipedia, CGTN, Turkey Today, Interfax, ANI, US National Science Foundation, GASTAT.


লেখক: সিরাজুর রহমান, শিক্ষক ও লেখক (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক), সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।


ডিবিসি/ এসভিএন

আরও পড়ুন