ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে। দীর্ঘায়িত এই সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখন বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে বলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান জেনারেল ড্যান কেইনের বরাতে জানা গেছে।
সিএনএনকে তিনটি সূত্র জানিয়েছে, জেনারেল কেইন মনে করেন, সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করা হলে তা উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে এবং শুধু বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। তাঁর এই অবস্থান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুমকির কিছুটা বিপরীত। কারণ, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি নিয়ে চুক্তিতে না এলে ইরানে ফের কঠোর হামলার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে নানামুখী চাপে প্রেসিডেন্টও এখন যুদ্ধের ইতি টানতে চাইছেন বলে জানা গেছে।
যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে বিকল্প কৌশল নির্ধারণে জেনারেল কেইন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বেশ তৎপর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে নিজেদের মধ্যে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে তিনি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের মতো শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করেছেন। এসব আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিগুলো তুলে ধরা। ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাই এখন কেইনের সঙ্গে একমত যে, কেবল বিমান হামলার ওপর নির্ভর করে ইরানকে পরাস্ত করা কঠিন। এ বিষয়ে কেইনের মুখপাত্র জোসেফ হলস্টেড, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বা সিআইএ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা কেইনের প্রশংসা করে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য একটি ‘সম্পদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যিনি প্রেসিডেন্টকে সর্বদা সঠিক ও নিরপেক্ষ তথ্য দিয়ে থাকেন।
গত মাসের শেষ দিকে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কাছে জেনারেল কেইন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার সক্ষমতা সীমিত হয়ে আসার বিষয়টি তুলে ধরেন, যা এখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দলের অনেকেও বিশ্বাস করেন। জুলাইয়ের শেষের দিকে ইরানে হামলা বাড়ানোর যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। সূত্রমতে, ওই সময় কেবল মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) একাংশ এবং ইসরায়েল এই পরিকল্পনার পক্ষে ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, ইরানে হামলা হলে পাল্টা আঘাত হিসেবে তাদের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মিত্রদের এই সতর্কবার্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসেন। উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারাও মার্কিন প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন যে, অস্ত্রের মজুত কম থাকায় ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার ইরানের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামো ও সেতুতে হামলার হুমকি দিলেও জেনারেল কেইন মনে করেন, এমন পদক্ষেপে ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। বরং এতে সাধারণ জনগণ তাদের সরকারের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়েও কেইন যথেষ্ট সচেতন। গত মাসে এক বৈঠকে তিনি প্রেসিডেন্টকে হামলার নেতিবাচক দিক ও গোলাবারুদ কমে যাওয়ার কথা জানালেও পরিস্থিতি অনুযায়ী ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করার সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন। তবে জেডি ভ্যান্সসহ অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, শুধু বোমা মেরে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এ নিয়ে কারও কারও মত, কেইন প্রেসিডেন্টের সামনে নিজের উদ্বেগের কথাগুলো যথেষ্ট দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করতে পারছেন না এবং অনেক কিছু চেপে যাচ্ছেন।
যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে এসে পেন্টাগন ও সেন্টকম ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প কৌশল নিয়ে মূল্যায়ন শুরু করেছে। সেন্টকমের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পাঠানো ই-মেইলে প্রচলিত সামরিক পদক্ষেপের বাইরে ভিন্ন উপায়ে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধের পাঁচ মাস পার হওয়ার পর এসে নতুন উপায়ের এই খোঁজ মূলত পরিস্থিতি যে ভালো যাচ্ছে না, তারই একটি নীরব স্বীকৃতি। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান হিসেবে এত দেরিতে বিকল্প খোঁজার বিষয়টি যুদ্ধ পরিচালনায় জেনারেল কেইনের কম অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। একটি সূত্রের মতে, তিনি এ ক্ষেত্রে তাঁর সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বড় এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছেন। সার্বিক দিক বিবেচনায় কেইন এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা এখন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার এমন একটি সম্মানজনক পথ খুঁজছেন, যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশবাসীর কাছে অন্তত একটি ‘প্রতীকী বিজয়’ দাবি করতে পারেন। একই সঙ্গে এতে যেন সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার পথও বন্ধ না হয়। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার একটি চুক্তির মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়ার সূচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ডিবিসি/এফএইচআর