ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লী উপজেলায় সন্তানদের অবহেলা ও অনিশ্চয়তার কারণে বেঁচে থাকতেই নিজের জন্য কবর তৈরি করে রেখেছেন ৮০ বছর বয়সী আয়েশা খাতুন। ঘটনাটি উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বড়বালিয়া পাইকারমনি গ্রামে।
আয়েশা খাতুন ওই গ্রামের মৃত আয়নাল হকের স্ত্রী। বিষয়টি জানাজানি হলে পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও মানবিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বামীর মৃত্যুর পর কিছুদিন বড় ও ছোট ছেলের বাড়িতে থাকলেও পারিবারিক কলহের জেরে সেখানে আর ঠাঁই হয়নি তার। পরে স্বামীর দেওয়া প্রায় আড়াই শতাংশ জমিতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় একটি ছোট ঘর তুলে বসবাস শুরু করেন তিনি।
বৃদ্ধার অভিযোগ, সন্তানরা তার কাছ থেকে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর আর কোনো খোঁজখবর রাখে না। এমনকি মৃত্যুর পর সঠিকভাবে দাফন করবে কি না- সেই আশঙ্কা থেকেই নিজের ঘরের পাশেই একটি কবর তৈরি করে রেখেছেন তিনি। প্রতিদিন সেই কবরের পাশ দিয়ে হাঁটেন, আর নীরবে মৃত্যুর অপেক্ষা করেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আয়েশা খাতুন বলেন, এত কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করলাম। এখন কেউ একবারও এসে জিজ্ঞেস করে না, আমি কেমন আছি। ঘরের ভেতর পানি পড়ে, বিদ্যুৎ নেই, অনেক সময় না খেয়েই দিন কাটে। তাই ভাবলাম, মারা গেলে যেন অন্তত কবরের জন্য কারও মুখাপেক্ষী হতে না হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল কাদের বলেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি এখানে একা থাকেন। আমরা প্রতিবেশীরা যতটা পারি সহযোগিতা করি। কিন্তু একজন মায়ের এমন অসহায় জীবন মেনে নেওয়া খুবই কষ্টের। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন,মা-বাবার শেষ বয়সে সন্তানেরাই সবচেয়ে বড় ভরসা। অথচ আয়েশা খাতুনকে নিজের কবর নিজেকেই তৈরি করে রাখতে হয়েছে। এটা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য লজ্জার বিষয়।
স্থানীয়দের দাবি, আয়েশা খাতুনের সন্তানরা সবাই স্বচ্ছল হলেও কেউ তার দায়িত্ব নিচ্ছেন না। মৃত্যুর পর যেন তাকে তার তৈরি করা কবরেই দাফন করা হয়- এ কথাও তিনি এলাকাবাসীকে বলে রেখেছেন।
এ বিষয়ে আয়েশা খাতুনের সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে পরিবারের কয়েকজন সদস্য বৃদ্ধার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি তদন্ত করে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বৃদ্ধার নিরাপদ বসবাস, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তার যথাযথ দেখভালের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাইরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি ওই বৃদ্ধা অসহায় অবস্থায় থাকেন, তাহলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ডিবিসি/এসএস