বাংলাদেশ, রাজধানী

ঢাকার প্রথম মেয়র মোহাম্মদ হানিফের জন্মদিন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ডিবিসি নিউজ

শনিবার ১লা এপ্রিল ২০২৩ ০৫:১৯:৩৩ অপরাহ্ন
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

আজ শনিবার (১ এপ্রিল) অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ৭৯তম জন্মদিন। ১৯৪৪ সালের এই দিনে তিনি পুরান ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

চারশো বছরের প্রাচীন শহর ঢাকা। ঐতিহ্য আর নানা সংস্কৃতির বৈচিত্রের কারণে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মেগাসিটি। সেই শহরের গৌরবের অপর নাম মোহাম্মদ হানিফ। পিতা আবদুল আজিজ আর মাতা মুন্নি বেগমের ছোট ছেলে ছিলেন তিনি। আদর করে সবাই তাকে ধনী নামে ডাকত।

শিশু হানিফ ছোটবেলায় মমতাময়ী মাকে হারান। মায়ের মৃত্যুর পর ফুফু আছিয়া খাতুনের কাছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য আর আদর্শে বেড়ে উঠেন তিনি। ঢাকার প্রখ্যাত পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মাজেদ সরদার ছিলেন ঢাকার শেষ সরদার। মোহাম্মদ হানিফের বহুমুখী প্রতিভা তাকে মুগ্ধ করে। তাই ১৯৬৭ সালে মাজেদ সরদার প্রিয়কন্যা ফাতেমা খাতুনকে মোহাম্মদ হানিফের সঙ্গে বিয়ে দেন।

এই দম্পতির একজন পুত্র ও দুইজন কন্যা সন্তান রয়েছে। পুত্র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত পূর্ণ মন্ত্রী মর্যাদায় মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৬০ সালে পুরান ঢাকার ইসলামিয়া হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে পরবর্তীতে তৎকালীন কায়েদে আযম কলেজে (শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ) উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিএ পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে কিছুদিন আইন বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন হানিফ। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ের পর গঠিত প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দেয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানকে দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার করে ২৪ ঘন্টার নোটিশে শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুনন্নেসা মুজিব ও তার পরিবারকে মন্ত্রীপাড়ার বাসা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয় পাকিস্তান সরকার। সে সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের রক্তচক্ষু, হুমকি-ধামকি উপেক্ষা করে মোহাম্মদ হানিফের পরিবারে পুরান ঢাকার ৭৯ নম্বর নাজিরা বাজার বাসায় অবস্থান নেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব ও তার পরিবার। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মোহাম্মদ হানিফকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।

ছাত্রাবস্থায় ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে রাজনীতি শুরু করেন হানিফ। উদার চিন্তাচেতনা, প্রখর ব্যক্তিত্ব ও সংবেদনশীলতা এবং দৃঢ় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনি সবার প্রিয় নেতায় পরিণত হন। শুরু থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মোহাম্মদ হানিফ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের প্রতি অবিচল ছিলেন। ১৯৬৫ সালে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিবের দায়িত্ব পান। এ সময় ছয়দফা মুক্তি সনদ প্রণয়ন ও প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সব আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে প্রথম কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু মোহাম্মদ হানিফকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন ও ভালোবাসতেন। তাই ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু তার ঢাকা-১২ আসন ছেড়ে দেন এবং মোহাম্মদ হানিফ জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে জাতীয় সংসদে হুইপের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ১৯৭৬ সালে মোহাম্মদ হানিফ ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

১৯৯৪ সালে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মির্জা আব্বাসকে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে ঢাকার প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। তারই নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহে ‘জনতার মঞ্চ’ গঠিত হয়, যা ছিল আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য এক টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি করে দলের বিজয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন মোহাম্মদ হানিফ।

হানিফ ছিলেন একজন ঈমানদার ও ধার্মিক মুসলমান। একইসঙ্গে ইসলামের মর্যাদা এবং দ্বীন প্রচারেও ছিলেন সোচ্চার। তিনি তার প্রিয় ঢাকা নগরীকে ইসলামী স্থাপত্য কলায় সাজিয়ে তুলতে সহায়তা করেছেন। যার সুবাদে মুসলিম প্রধান দেশের রাজধানীতে বিদেশী মেহমান কেউ নেমেই যেন বুঝতে পারেন তারা কোথায় এসেছেন। বুকে হাজারও স্বপ্ন থেকে তা বাস্তবে রুপায়নের জন্য মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সচেষ্ট থেকেছেন। তিনি মুসলিম হলেও অন্যান্য ধর্মালম্বীদের কাছে ছিলেন পরমপ্রিয়। দুর্গাপূজা কিংবা বড়দিন অথবা অন্য কোন উৎসবে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। তার সহায়তায় অসংখ্য মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা সংস্কার করা হয়।

তার আমলে ঢাকার উন্নয়নে রাস্তাঘাট, নর্দমা, ফুটপাত উন্নয়ন ও সংস্কার, নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে রোড ডিভাইডার নির্মাণ, আন্ডারপাস, সেতু, ফুটভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়। পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয় ধানমন্ডি লেক এবং আশেপাশের এলাকা। ঢাকাবাসী সুপেয় পানির চাহিদা পূরণে তিনি নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ঢাকার সৌন্দর্য বাড়ানো ও নগরবাসীর চাহিদা পূরণে নগরীতে বিজলী বাতি স্থাপন, নগর সৌন্দর্য বর্ষনে ফোয়ারা নির্মাণ, বনায়ন কর্মসূচি, পুরান ঢাকার আউটফলে ছিন্নমূল শিশু কিশোরদের প্রশিক্ষন ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ করেন।

নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী ছিলেন মেয়র হানিফ। নারী শিক্ষা বিস্তারে লক্ষীবাজারে প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ। এছাড়াও মহিলাদের মাতৃকালীন সময়ে পরিচর্যার জন্য নগরীতে বেশ কয়েকটি মাতৃসদন নির্মাণ করেন। শিশুবান্ধব ঢাকা পড়তে নিরলস কাজ করেছেন নগরপিতা হানিফ। শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য পৌর শিশু পার্ক নির্মাণ ও পুরাতন পার্ক গুলোতে প্রাণ ফিরিয়ে আনা, এছাড়াও বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণ করে গেছেন।

মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ ঢাকাবাসীর কষ্ট লাঘব করতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা, মশক নিধন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। 

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। এ সময় নিজের জীবন তুচ্ছ করে মানবঢাল তৈরি করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেন মোহাম্মদ হানিফ। একের পর এক ছোড়া গ্রেনেডে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রাণে রক্ষা পেলেও মারাত্মক আহত হন তিনি। তার মস্তিষ্কসহ দেহের বিভিন্ন অংশে অসংখ্য স্প্লিন্টার ঢুকে পড়ে। দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেই মোহাম্মদ হানিফ জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন। ২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তাঙ্গনে সন্ত্রাসবিরোধী এক সমাবেশে সভাপতির বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর রাতে ৬২ বছর বয়সে মারা যান তিনি।

ডিবিসি/রূপক

সূত্র: উইকিপিডিয়া, বিভিন্ন পত্রিকা

আরও পড়ুন