ঠাকুরগাঁও মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র

সিজার বন্ধ ৪ মাস, পাম্পের টাকা বাকি থাকায় বন্ধ অ্যাম্বুলেন্সও

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

ডিবিসি নিউজ

১ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

নিয়মিত গর্ভকালীন সেবা নিয়েছেন ঠাকুরগাঁও মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র থেকেই। চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে আশা করেছিলেন সন্তানের জন্মও হবে এই সরকারি প্রতিষ্ঠানেই। কিন্তু প্রসববেদনা নিয়ে পৌঁছানোর পর সেই আশা মুহূর্তেই ভেঙে যায় রেশমা আক্তারের।

কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, প্রসবে জটিলতা তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব নয়, জরুরি সিজারিয়ান করতে হবে। কিন্তু চার মাস ধরে ঠাকুরগাঁও মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে সিজারিয়ান কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাকে অন্য হাসপাতালে যেতে হবে।

 

এ কথা শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রেশমা। তার স্বামী একজন দোকানের কর্মচারী। সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয় সেখানে বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ানের অতিরিক্ত খরচ বহন করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব।

 

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে রেশমা আক্তার বলেন, গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি। ভেবেছিলাম এখানেই সন্তান জন্ম হবে। কিন্তু এখন বলছে সিজার হয় না, বাইরে যেতে হবে। এখানে যদি সিজারের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে আমাকে অন্য হাসপাতালে যেতে হতো না। আমাদের এত টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই।

 

রেশমার মতো এমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন আরও অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারী। এনেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ঠাকুরগাঁও মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে সিজারিয়ান কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব না হলে রোগীদের অন্য হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে।

 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একসময় রোগীর ভিড়ে ব্যস্ত থাকা কেন্দ্রটির ওয়ার্ডগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। অপারেশন থিয়েটারে নেই কোনো কর্মব্যস্ততা। সিজারিয়ান সেবা বন্ধ থাকায় দিন দিন কমছে রোগীর সংখ্যা। অনেকে আগেই অন্য হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন।

 

রেশমার স্বামী বলেন, আমি একটি দোকানে চাকরি করি। অল্প আয়ে সংসার চালাই। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা হবে ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন বাইরে যেতে বলা হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালে সিজার করতে অনেক টাকা লাগে। আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য এটা খুব কষ্টের।

 

একই চিত্র দেখা গেছে সদর উপজেলার বাসিন্দা সুরাইয়া বেগমের ক্ষেত্রেও। প্রসবের জন্য মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে এলেও প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাব বলে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু সিজার হয় না বলে অন্য হাসপাতালে যেতে বলেছে। গরিব মানুষের জন্য বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করানো অনেক কষ্টের। যদি এখানেই সিজারের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে আমাদের এত ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।

 

রোগীর স্বজন আহাদুল হোসেন বলেন, এখানে নরমাল ডেলিভারি না হলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। জরুরি সময়ে বাইরে যেতে গিয়ে রোগী নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়, আবার অতিরিক্ত টাকাও খরচ হয়।

 

শুধু সিজারিয়ান সেবাই নয়, চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটও রয়েছে কেন্দ্রটিতে। প্রয়োজনীয় ডেলিভারি কিট সীমিত পরিমাণে আসায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া কেন্দ্রের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটিও দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

 

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. লাবনী বসাক বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আমাদের এনেসথেসিয়া ডাক্তার অবসরে গেছেন। অবসরের পরও আমরা তাকে দিয়ে এক মাস কাজ করিয়েছি। এরপর থেকে তিনি আর আসছেন না। সে কারণেই সিজারিয়ান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কিছু কিছু মায়ের নরমাল ডেলিভারি সম্ভব হয় না, তখন সিজারিয়ানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের সিজারিয়ান সেকশন আপাতত বন্ধ থাকায় তাদের অন্য হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে।’

 

অ্যাম্বুলেন্স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই বছর ধরে আমরা জ্বালানির বাজেট পাচ্ছি না। পেট্রোল পাম্পের কাছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। তাই তারাও আর জ্বালানি দিচ্ছে না।

 

চিকিৎসাসামগ্রীর বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ নয়, তবে খুবই সীমিত। জানুয়ারি মাসে আমরা আটটি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র দুটি ডেলিভারি কিট পেয়েছি। অথচ আমাদের প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২টি কিট প্রয়োজন হয়।’

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, একজন এনেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি মাতৃসেবা কেন্দ্রের সিজারিয়ান কার্যক্রম মাসের পর মাস বন্ধ থাকলেও তা চালুর কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। তাদের দাবি, দ্রুত এনেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ এবং অ্যাম্বুলেন্স সচল করে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করা হোক।

 

ডিবিসি/এসএস

আরও পড়ুন