বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত অনন্য এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সেন্টমার্টিন দ্বীপ। প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। তবে বর্তমানে এই পর্যটন দ্বীপটি ক্ষুধার্ত কুকুরের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তীব্র খাদ্যসংকটের কারণে বেওয়ারিশ কুকুরের দল দ্বীপজুড়ে চষে বেড়াচ্ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পর্যটন মৌসুমে দ্বীপের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোর ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে কুকুরগুলো কোনোমতে বেঁচে থাকে। ওই সময়ে খাবারের অভাব না থাকায় তারা সাধারণত শান্ত থাকে। তবে পর্যটন মৌসুম শেষ হতেই দ্বীপে নেমে আসে তীব্র খাদ্যসংকট। ক্ষুধার্ত কুকুরগুলো তখন খাবারের খোঁজে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায় এবং প্রায়শই স্থানীয় মানুষ ও শিশুদের ওপর আক্রমণ করে।
দ্বীপের পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা মোঃ এরশাদ বলেন, পর্যটন মৌসুম বন্ধ হলে দ্বীপে কুকুরের সমস্যা কতটা গুরুতর, তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। খাবারের অভাবে কুকুরগুলো ক্ষুধার্ত ও হিংস্র হয়ে ওঠে। আমার বাবা এবং আমার ভাতিজাও কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়েছে। প্রশাসন ও এনজিওর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেওয়া হলেও দ্বীপে কুকুরের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান গলাচিপা এলাকার বাসিন্দা জুবায়ের। তিনি বলেন, আগে খাবারের অভাবে কুকুরগুলো ছোট ছোট শিশুদের কামড়ে দিত। জেলেরা মাছ ধরতে গেলে কুকুরগুলো পেছনে পেছনে ঘুরে কাজে বাধা সৃষ্টি করত। তবে গত কয়েক মাস ধরে একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে খাবার দেওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
খাদ্যসংকটের কারণে অতীতে সেন্টমার্টিনে এক শোচনীয় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'ফাইন্ডিং হোপ'-এর প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম জানান, অতীতে তীব্র খাদ্যকষ্টে দ্বীপের আড়াই হাজারেরও বেশি কুকুর মারা গিয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল যে, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে জীবিত কুকুরগুলো মৃত কুকুরের মাংস খেতে বাধ্য হয়েছিল। সেই বিভীষিকাময় সময়ের ক্ষত এখনও কুকুরগুলোর আচরণে স্পষ্ট।
দ্বীপের এই অবলা প্রাণীদের বাঁচাতে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে এগিয়ে আসেন 'ফাইন্ডিং হোপ' নামক সংগঠনের চেয়ারম্যান আরিজ উল মুল্ক। শুরুতে একটি দল সেন্টমার্টিনে এসে কাজ শুরু করলেও নানা প্রতিকূলতায় তারা ফিরে যান। তবে কার্যক্রম থামেনি। চেয়ারম্যান আরিজ উল মুল্কের পাঠানো অর্থায়নে বর্তমানে স্থানীয় চারজন স্বেচ্ছাসেবীর সহায়তায় প্রতি ৪৮ ঘণ্টা পরপর আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার কুকুরকে খাবার দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবার প্রায় সাড়ে পাঁচ বস্তা (প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি) চাল, ডিম ও সবজি দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে কুকুরগুলোর মাঝে বিতরণ করা হয়। এর ফলে কুকুরগুলোর কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়েছে এবং তাদের হিংস্র আচরণও কমেছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের মার্চ মাসে সেন্টমার্টিন দ্বীপের পরিবেশ ও মানুষের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রশাসন ৩৬টি কুকুর খাঁচায় বন্দি করে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে স্থানান্তরিত করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের তীব্র আপত্তির মুখে কুকুর স্থানান্তর কার্যক্রমটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার্থে ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী সেন্টমার্টিন দ্বীপের চারপাশের ১,৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফলে ঢালাওভাবে কুকুর নিধন বা অপসারণ আইনত জটিল।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মো. অনীক চৌধুরী জানান, দ্বীপে কুকুরের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে খুব শিগগিরই সেন্টমার্টিনে কুকুরের নির্বীজকরণ কার্যক্রম শুরু করা হবে। আশা করছি, এই স্থায়ী উদ্যোগটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দ্বীপে কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং স্থানীয়দের আতঙ্ক দূর হবে।
ডিবিসি/এসএফএল