সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৬ সালের এই দিনে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ৮২ বছর বয়সে গুণী এ লেখকের মৃত্যু হয়।
সৈয়দ শামসুল হককে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠের পাশে সমাহিত করা হয়। তার সমাধিকে ঘিরে স্মৃতি কমপ্লেক্স করার কথা থাকলেও আজও তা নির্মাণ না হওয়ায় সংস্কৃতিকর্মী ও স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ।
১৯৩৫ সালের ২৭শে ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম শহরের পুরাতন থানাপাড়া এলাকায় সৈয়দ শামসুল হক জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও হালিমা খাতুন দম্পতির আট সন্তানের প্রথম সন্তান। বাবা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার ছিলেন। এক ছেলে ও এক মেয়ের গর্বিত বাবা সৈয়দ হক। তার স্ত্রী ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হক।

স্কুলজীবন শেষ করেন কুড়িগ্রামে। এরপর মুম্বাইতে কিছুদিন চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থায় কাজ করেন। পরবর্তীতে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে পড়ালেখা শেষ না করেই পুরোদমে লেখালেখি শুরু করেন। ‘দেয়ালের দেশ’ তার প্রথম উপন্যাস।
কর্মজীবনের প্রায় সাত বছর কাটিয়েছেন লন্ডনে বিবিসি বাংলা বিভাগের সঙ্গে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বিবিসি থেকে সংবাদ পরিবেশন করেছেন ।
লেখালেখির জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অসাধারণ সৃষ্টিশীলতার সাক্ষর রাখেন। প্রাপ্তিও অনেক। তিনি স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছিলেন মাত্র ২৯ বছর বয়সে।

বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারেও তার সংযোগও অনেক। তার কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- একদা এক রাজ্যে (১৯৬১), বিরতিহীন উৎসব (১৯৬৯), বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা (১৯৭০), প্রতিধ্বনিগণ (১৯৭৩), অপর পুরুষ (১৯৭৮), পরাণের গহীন ভিতর (১৯৮০), নিজস্ব বিষয় (১৯৮২), রজ্জুপথে চলেছি (১৯৮৮), বেজান শহরের জন্য কোরাস (১৯৮৯), এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি (১৯৮৯), অগ্নি ও জলের কবিতা (১৯৮৯), কাননে কাননে তোমারই সন্ধানে (১৯৯০), আমি জন্মগ্রহণ করিনি (১৯৯০), তোরাপের ভাই (১৯৯০), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯০), রাজনৈতিক কবিতা (১৯৯১), নাভিমূলে ভস্মাধার, কবিতা সংগ্রহ, প্রেমের কবিতা, ধ্বংস্তূপে কবি ও নগর (২০০৯)।
কাব্যনাট্যেও রয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের অনন্য অবদান। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নুরুলদীনের সারা জীবন, এখানে এখন, গণনায়ক প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যনাট্য। ‘কোনটে বাহে জাগো সবায়’ বহুল উচ্চারিত এই সংলাপটি তার ‘নুরুলদীনের সারা জীবন’ নাটকের।

গল্পগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- তাস (১৯৫৪), শীত বিকেল (১৯৫৯), রক্তগোলাপ (১৯৬৪), আনন্দের মৃত্যু (১৯৬৭), প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান (১৯৮২), সৈয়দ শামসুল হকের প্রেমের গল্প (১৯৯০), জলেশ্বরীর গল্পগুলো (১৯৯০), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯০)।
তিনি ১৯৫৯ সালে ‘মাটির পাহাড়’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেন। এরপর ‘তোমার আমার’, ‘শীত বিকেল’, ‘সুতরাং’, ‘রাজা এল শহরে’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘কাঁচ কাটা হীরে’, ‘পুরস্কার’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘বড় ভাল লোক ছিল’,সহ আরও বেশ কিছু চলচ্চিত্রের কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেন। ‘বড় ভাল লোক ছিল’ ও ‘পুরস্কার’ এ দুটি চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা সব্যসাচী এই লেখক। ‘এমন মজা হয় না গায়ে সোনার গয়না’, ‘এই যে আকাশ এই যে বাতাস’, ‘তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া’- এসব গান তারই লেখা।
কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, কাব্যনাট্য, চিত্রনাট্য, গান, প্রবন্ধ, অনুবাদসহ সাহিত্যের প্রায় সকল ক্ষেত্রে সাবলীল লেখনীর জন্য তাকে 'সব্যসাচী লেখক' হিসাবে অভিহিত করা হয়।