জেলার সংবাদ

স্ত্রী-সন্তানসহ সেন্টমার্টিনে ফিরল মালেশিয়া প্রবাসীর মরদেহ, দাফন করা হলো মায়ের কবরের পাশে

টেকনাফ প্রতিনিধি

ডিবিসি নিউজ

১ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সেন্টমার্টিন থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন তিন বন্ধু জুলফিকার, তারেকুর রহমান ও শাহাজাহান। দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সেই যাত্রায় ২৮ দিন সাগরে এবং প্রায় ৪০ দিন থাইল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকায় দালালদের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর তারা মালয়েশিয়ায় পৌঁছান।

প্রায় এক যুগের প্রবাসজীবন শেষে সেই তিন বন্ধুর একজন তারেকুর রহমান ফিরলেন জন্মভূমি সেন্টমার্টিনে। তবে জীবিত অবস্থায় নয়, নিথর দেহে। মালয়েশিয়ায় কর্মস্থলে একটি বহুতল ভবন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

 

নিহত তারেকুর রহমান সেন্টমার্টিনের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা। তার মরদেহের সঙ্গে স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাও দেশে ফিরেছেন। পরে সেন্টমার্টিনের বড় কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

 

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ আগস্ট মালয়েশিয়ায় কর্মস্থলে একটি বহুতল ভবন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তারেকুর রহমান। প্রথমে তাকে মালয়েশিয়ার কলম্বিয়া এশিয়া হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সুলতানাহ আমিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ আগস্ট রাত প্রায় ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

 

মালয়েশিয়া থেকে তার মরদেহ ২৭ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পরদিন ২৮ আগস্ট একটি হিমায়িত মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহটি শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাটে নেওয়া হয়। দুপুর ১২টার দিকে মরদেহ জেটিঘাটে পৌঁছানোর পর বিকেল ৩টার দিকে ট্রলারে করে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়।

 

সেন্টমার্টিন জেটিঘাটে মরদেহ পৌঁছালে সেখানে শত শত মানুষ ভিড় করেন। স্বজন, বন্ধু ও এলাকাবাসী শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে একনজর দেখতে জড়ো হন। পরে আসরের নামাজের পর সেন্টমার্টিন জেটিঘাটের দক্ষিণ পাশে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সেন্টমার্টিনের বড় কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

 

তারেকুর রহমানের বন্ধু ও মালয়েশিয়া প্রবাসী জুলফিকার জানান, তারা তিন বন্ধু সেন্টমার্টিনের একই এলাকার বাসিন্দা। সে সময় তারা সেন্টমার্টিন বিএন ইসলামিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। জেএসসি পরীক্ষায় তিনটি বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পর বাকি পরীক্ষা না দিয়েই ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তারেকুর রহমান, শাহাজাহান ও জুলফিকার সেন্টমার্টিন থেকে ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

 

জুলফিকার বলেন, ‘আমাদের প্রায় ২৮ দিন সাগরে থাকতে হয়েছিল। পরে দালালদের নিয়ন্ত্রণে থাইল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৪০ দিন ছিলাম। এরপর প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা করে নিয়ে দালালরা আমাদের ছেড়ে দেয়।’

 

মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর শাহাজাহান একটি ছাগলের খামারে কাজ শুরু করেন। তারেকুর রহমান প্রথমদিকে একটি পাঁচতারকা হোটেলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি বহুতল ভবন নির্মাণকাজে শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘদিন প্রবাসে বিভিন্ন পেশায় কাজ করার পর শেষ পর্যন্ত কর্মস্থলের দুর্ঘটনাতেই তার জীবনাবসান ঘটে।

 

নিহত তারেকুর রহমানের স্ত্রী মোছা. হারিরা আক্তারও তার সঙ্গে মালয়েশিয়ায় বসবাস করতেন। জানা গেছে, ২০২৩ সালে তারেকুর রহমান স্ত্রীকে টুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় নিয়ে যান। হারিরা আক্তার সেন্টমার্টিনের কোনাপাড়ার বাসিন্দা হাফেজ আবু তৈয়ুবের মেয়ে।

 

এই দম্পতির দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। একজনের বয়স প্রায় আড়াই বছর, অন্যজনের বয়স মাত্র চার মাস। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে মালয়েশিয়ায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন তারেকুর রহমান।

 

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সেন্টমার্টিন পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মো. ইলিয়াসের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তারেকুর রহমান ছিলেন দ্বিতীয়। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনজন মেয়ে ও দুজন ছেলে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, তিনি নিয়মিত প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে না পারলেও কোরবানিসহ বিভিন্ন পারিবারিক প্রয়োজনে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা করে পাঠাতেন।

 

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুর রহমান বলেন, ‘তারেকুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় নির্মাণশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশায় কাজ করতেন। সেখানে একটি দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। কিছু কাগজপত্রের জটিলতার কারণে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সমস্যা হচ্ছিল।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘মরদেহ এবং তার স্ত্রীসহ দুই সন্তানকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য তিন দিন ধরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আমরা কাজ করেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। শেষ পর্যন্ত মরদেহসহ তার পরিবার বাংলাদেশে ফিরেছে। পরে নিজ জন্মভূমি সেন্টমার্টিনে মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়েছে।’

 

উন্নত জীবনের স্বপ্নে তিন বন্ধুর একসঙ্গে সাগরপথে শুরু হয়েছিল প্রবাসযাত্রা। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর সেই তিন বন্ধুর একজন তারেকুর রহমান ফিরলেন জন্মভূমিতে তবে জীবিত নয়, নিথর দেহ হয়ে। স্ত্রী ও দুই ছোট শিশুকন্যাকে রেখে মায়ের কবরের পাশেই হলো তার শেষ ঠিকানা।

 

ডিবিসি/এমএনকে

আরও পড়ুন