হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনতে শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আপাতত স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে ‘বড় ধরনের অগ্রগতি’ হয়েছে দাবি করে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকবে বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন। এদিকে, তেহরান ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্প অভিযান সাময়িক স্থগিতের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, কয়েকদিন আগে শুরু হওয়া এই অভিযান ‘স্বল্প সময়ের জন্য’ বন্ধ রাখা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা পাকিস্তানের অনুরোধেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছিলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ তার লক্ষ্য পূরণ করায় শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, “আমরা শান্তির পথকেই অগ্রাধিকার দিতে চাই। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একটি সমঝোতাই চান।” তবে ট্রাম্পের স্থগিতাদেশের এই সিদ্ধান্ত অনেকের জন্যই বিস্ময়কর ছিল, কারণ এর আগের দিনজুড়েই মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছিলেন যে, এই অভিযান হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে নৌযান চলাচল এবং বাণিজ্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন আগেই জানিয়েছিল, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ এবং ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ আলাদা দুটি অভিযান। অবরোধের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা; আর ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর লক্ষ্য ছিল উপসাগরে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে এনে তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো। ওয়াশিংটন মনে করছে, অভিযান সাময়িক বন্ধ রাখার মাধ্যমে তেহরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরানো সম্ভব হতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিরতির সময় যদি ইরানের হস্তক্ষেপে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি বা বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম চালাতে না পারে, তাহলে ট্রাম্পের পক্ষে অভিযানের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলে দাবি করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরে বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি চালু করতে ব্যর্থ হয়ে ট্রাম্প ‘পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন’। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই অসহনীয় হয়ে উঠবে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররাই নৌ চলাচল ও জ্বালানি পরিবহনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে, তবে তাদের এই অপচেষ্টা ব্যর্থ হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালানোর মাধ্যমে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে। এর জবাবে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যে পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। পরবর্তীতে এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। এর আওতায় ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করলেও খুব কম সংখ্যক জাহাজই হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পেরেছে। এরই মাঝে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নিজস্ব অবরোধও আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
ডিবিসি/এফএইচআর