গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই পথটি পুনরায় খুলে দিতে মাইন অপসারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে আধুনিক প্রযুক্তির এসব মাইনের সঠিক অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় পুরো অভিযানটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের বড় যুদ্ধজাহাজগুলো ধ্বংস হলেও তেহরান ছোট নৌযানের সাহায্যে হরমুজের বিভিন্ন অংশে মাইন পেতে রেখেছে। মাইনের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও নির্দিষ্ট মাশুল বা ‘টোল’ পরিশোধকারী জাহাজগুলোকেই কেবল যাতায়াতের সুযোগ দিচ্ছে ইরান।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, বর্তমানে ইরান নিজেও সব মাইনের সঠিক অবস্থান শনাক্ত বা অপসারণ করতে সক্ষম নয়। নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরানের হাতে এখনো ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ছোট মাইনবাহী নৌকা অক্ষত রয়েছে। ড্রোন, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও দ্রুতগামী নৌযানের পাশাপাশি মাইনই এখন তাদের প্রধান প্রতিরক্ষা অস্ত্র। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান মূলত ‘মাহাম-৩’ এবং ‘মাহাম-৭’ নামের দুই ধরনের আধুনিক মাইন ব্যবহার করেছে। ৩০০ কেজি ওজনের ‘মাহাম-৩’ মাইন ১০০ মিটার গভীর পর্যন্ত কাজ করতে পারে। অন্যদিকে, ২২০ কেজি ওজনের ‘মাহাম-৭’ মাইনটি সমুদ্রের তলদেশে অবস্থান করে এবং এর বিশেষ নকশার কারণে এটি শনাক্ত করা কঠিন। আধুনিক সেন্সরযুক্ত এই মাইনগুলো জাহাজের সংস্পর্শে না এসেও কেবল চৌম্বকীয় বা শব্দতরঙ্গের মাধ্যমেই বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম।
মাইন পাতা সহজ হলেও তা অপসারণ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও বিপজ্জনক। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে মাইন পরিষ্কারকারী জাহাজগুলো সহজেই ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। এ ঝুঁকি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বেশ কয়েকটি বিকল্প রয়েছে। পানির নিচে মাইন শনাক্তে চালকবিহীন জলযান ‘নাইফফিশ’ এবং দ্রুতগামী চালকবিহীন নৌযান ‘এমসিএম’ ব্যবহার করতে পারে ওয়াশিংটন। এছাড়া এমএইচ-৬০এস হেলিকপ্টার থেকে ‘আর্চারফিশ’ নামক সিস্টেম ব্যবহার করেও মাইন ধ্বংস করা সম্ভব। এসব পদ্ধতিতে মানুষের জীবনের ঝুঁকি কমলেও ড্রোন নিয়ন্ত্রণের জন্য মার্কিন জাহাজ বা হেলিকপ্টারকে মাইনের কাছাকাছি থাকতে হবে। ফলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে সেগুলোও ইরানি হামলার ঝুঁকিতে পড়বে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, মাইনের মাধ্যমে কোনো আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ বন্ধ করা নিষিদ্ধ। তবে ইরান হরমুজ প্রণালির একাংশকে নিজেদের আঞ্চলিক জলসীমা বলে দাবি করে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই ১৯৯৪ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সনদে স্বাক্ষর করেনি। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, দুই দেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাবস্থায় থাকায় ইরান মাইন পোঁতার বিস্তারিত মানচিত্র আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
ডিবিসি/এফএইচআর