কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে ইরানি অবরোধের মুখে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তা দিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই মুহূর্তে ‘প্রস্তুত নয়’ বলে স্বীকার করেছে হোয়াইট হাউস। একদিকে ইরান এই জলপথ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তেলের উচ্চমূল্য প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই লাভজনক।
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট সিএনবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "আমরা এখনই জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার অবস্থায় নেই। আমাদের সমস্ত সামরিক শক্তি বর্তমানে ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা এবং তাদের উৎপাদন শিল্প ধ্বংস করার কাজে নিয়োজিত।"
যদিও এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন নৌবাহিনী দিয়ে জাহাজ এসকর্ট করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু রাইট স্পষ্ট করেছেন যে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের জন্য বর্তমানে এই সাময়িক বিঘ্ন মেনে নিতে হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা স্থায়ীভাবে নির্মূল করা।
ইরানের নবনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার প্রথম জনসমক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যুদ্ধ চলাকালীন হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখা হবে। তিনি বলেন, "জনগণের ইচ্ছা হলো একটি কার্যকর এবং প্রতিরোধমূলক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখা। হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার কৌশল অব্যাহত থাকবে।"
ইরানি সামরিক বাহিনী পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে জানিয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনী যদি জাহাজ পাহারা দিতে আসে, তবে তারা সেই বাহিনীর ওপর সরাসরি হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না। গত বুধবারই প্রণালীর কাছে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার, যা গত রবিবার ১২০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল। বর্তমানে এটি ৮০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ সরবরাহ হয় বলে এই অচলাবস্থায় বিশ্বজুড়ে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়েছে। গত মাসে দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ছিল ২.৯৪ ডলার, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৬০ ডলারে। এর ফলে সাধারণ পণ্যের দাম ও মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এতসব অস্থিরতার মাঝেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দাবি করেছেন, তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ। তিনি লেখেন, "যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। তাই তেলের দাম বাড়লে আমরা অনেক অর্থ উপার্জন করি।" তবে একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন যে, তার প্রধান লক্ষ্য অর্থ নয়, বরং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালীর এই সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে এক দীর্ঘস্থায়ী মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানি সংকটের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের ফলে ইতোমধ্যে ইরানে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
ডিবিসি/এসএফএল