আগামী মাস থেকে হাইস্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে ফ্রান্স সরকার। তবে দেশটির বিভিন্ন শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট সংগঠন সতর্ক করেছে, এত অল্প সময়ে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
গত জুলাইয়ে ফ্রান্সের পার্লামেন্ট ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং হাইস্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধের বিধান অনুমোদন করে।
শিশুদের স্ক্রিনের সামনে কাটানো সময় কমানোর লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফরাসি সরকারের আশঙ্কা, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে চলতি মাসের শুরুতে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার বিধান বাতিল করে দেয়। এতে মাখোঁর উদ্যোগ বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
তবে হাইস্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার পৃথক বিধানটি নিয়ে সাংবিধানিক পরিষদ কোনো আপত্তি জানায়নি।
সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সরকারের মুখপাত্র মউদ ব্রেজোঁ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-সংক্রান্ত বিধান বাতিল হলেও মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের আইন কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মাখোঁ।
তিনি বলেন, এর ফলে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই হাইস্কুলে মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব হবে এবং এ ক্ষেত্রে একটি স্থিতিশীল ও আইনগত কাঠামো থাকবে।
ফ্রান্সে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় সেপ্টেম্বরে।
দেশটিতে এরই মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ রয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এবার হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদেরও একই বিধিনিষেধের আওতায় আনা হচ্ছে।
জুলাইয়ের শুরুতেই হাইস্কুলগুলোকে সেপ্টেম্বর থেকে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছিল। পরে একই মাসে পার্লামেন্টে আইনটি পাস হয়।
তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে প্রতিটি স্কুলকে তাদের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা সংশোধন করতে হবে। এখানেই দেখা দিয়েছে বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ।
ফ্রান্সের স্কুলপ্রধানদের অন্যতম বড় সংগঠন এসএনপিডিইএন-ইউনসার জাতীয় সম্পাদক ফ্রাঁসোয়া রেসনে সময় নির্বাচনকে ‘খারাপ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, অনেক স্কুলই এখনো প্রস্তুত নয়। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হচ্ছে এমন একটি নিয়ম নিয়ে, যা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নীতিমালায় এখনো যুক্ত হয়নি। কিছু স্কুল আগাম প্রস্তুতি নিলেও সেই সংখ্যা খুবই সীমিত।
সংগঠনটির উপ-মহাসচিব ক্রিস্টেল কফম্যান অবশ্য আগেভাগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাঁর হাইস্কুলে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই করিডর ও ভবনের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকবে, তবে খোলা জায়গায় তা ব্যবহার করা যাবে।
তাঁর মতে, ফ্রান্সের সব হাইস্কুলে এই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করতে প্রায় এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
কফম্যান বলেন, তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া সহজ নয়। আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হওয়ার কথা হলেও বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। প্রতিটি শিক্ষার্থীর পেছনে একজন তদারককারী রাখা সম্ভব নয়।
ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় অক্সিতানি আঞ্চলিক পরিষদের সহসভাপতি কামেল শিবলি জানান, দেড় হাজার শিক্ষার্থীর একটি হাইস্কুলে স্মার্টফোন রাখার জন্য ডিজিটাল পাউচ ও লকারের ব্যবস্থা করতে প্রায় ৪০ হাজার ইউরো খরচ হতে পারে।
হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা নিয়মিতই স্মার্টফোন ব্যবহার করে ক্লাসের সময়সূচি, কক্ষ পরিবর্তন এবং অন্যান্য শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য দেখতে। কিছু শিক্ষকও গবেষণা, অনুশীলন এবং নথি আদান-প্রদানের কাজে শ্রেণিকক্ষে ফোন ব্যবহার করেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় অবশ্য ‘শিক্ষামূলক ব্যবহার’ এবং ‘স্কুলের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয়’ ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যবহারে ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এদিকে ১৫ বছরের কম বয়সীদের টিকটকের মতো অ্যাপ ব্যবহার থেকে বিরত রাখার পরিকল্পনা থেকেও সরে আসছেন না মাখোঁ। প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, এ বিষয়ে নতুন করে একটি খসড়া আইন তৈরির কাজ করবে সরকার।
সরকারের মুখপাত্র ব্রেজোঁ বলেন, আগামী বসন্তের মধ্যেই শিশু ও তরুণদের সুরক্ষায় একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো তৈরি করতে চান প্রেসিডেন্ট।
দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক সীমা পূর্ণ হওয়ায় আগামী বসন্তেই প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়ার কথা রয়েছে ইমানুয়েল মাখোঁর।
ডিবিসি/ আরএফই