চীনের জাতীয়তাবাদী সরকারের বিরুদ্ধে এবার তিব্বতে ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ চালানোর অভিযোগ উঠেছে। গত কয়েক বছর ধরে চীন সরকার ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন আইন বানাচ্ছে। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, চীন সরকার তিব্বতী শিশুদের তিব্বতী ভাষা শিখতে দিতে চায় না।
চীন সরকার তার ‘জাতীয় সাধারণ ভাষা’ (ম্যান্ডারিন) সর্বস্তরে বিস্তৃত করতে চায় এবং এ ভাষায় সব শিশুকে পড়ালেখা শেখাতে চায়। এর মধ্য দিয়ে চীন মূলত তিব্বতের শিশুদের নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহ্যকে ভুলিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে চীনা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তিব্বতী পরিচয় ধরে রাখার মূল অনুঘটক হচ্ছে তিব্বতী ভাষা। এ কারণে তিব্বতী ভাষাকে মুছে দিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চীন ম্যান্ডারিন ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
রেডিও ফ্রি এশিয়ার (আরএফএ) তথ্য অনুযায়ী, কিংহাই প্রদেশের (তিব্বতিরা যেটিকে তাদের ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের সোঙ্গন প্রদেশ হিসেবে জানে) সব নগর ও শহরে চীন সরকার থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শীতকালীন ছুটিতে বাচ্চাদের কোনো ব্যক্তি বা কোনো সংগঠন অনানুষ্ঠানিকভাবেও তিব্বতী ভাষা শেখাতে পারবে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো প্রাক্-প্রাথমিকে তিব্বতী ভাষা বা বর্ণ পরিচয় বাচ্চাদের শেখাতে দেওয়া হয় না। এ কারণে ছুটির সময় বাড়িতে অভিভাবকেরা বাচ্চাদের তিব্বতী বর্ণপরিচয় শেখাতেন। কিন্তু এবারের শীতকালীন ছুটিতে তা যাতে শেখানো না হয়, সে জন্য চীন সরকার তিব্বতীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে।
মাস কয়েক আগে চীনা কর্তৃপক্ষ সোঙ্গন এলাকার কয়েকটি বেসরকারি স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। যেসব স্কুলে তিব্বতী ভাষা শেখানো হয় এবং তিব্বতী সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহ দেওয়া হয় বলে চীনা কর্তৃপক্ষ খবর পায়, সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ইতিমধ্যে তিব্বতের যাবতীয় নথি, নোটিশ, যোগাযোগ এবং চিঠিপত্র লেখায় চীনা ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে তরুণ প্রজন্ম এ ভেবে দুশ্চিন্তায় আছে যে খুব ঠান্ডা মাথায় তাদের মাতৃভাষাকে চীনা কর্তৃপক্ষ মেরে ফেলছে। তারা বুঝতে পারছে, মাতৃভাষায় মনের ভাব যত সহজে প্রকাশ করা যায়, চীনা ভাষায় তা সম্ভব হয় না।
২০১০ সালে মাতৃভাষায় আঘাত আসার প্রতিবাদে সোঙ্গন প্রদেশের তোগরেন এলাকায় প্রায় সাত হাজার তিব্বতী তরুণ শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেছিলেন। মনে করা হচ্ছে, চীন যদি তিব্বতী ভাষাকে কোণঠাসা করা অব্যাহত রাখে, তাহলে তা তিব্বতী জনসাধারণকে আন্দোলনমুখী করে তুলতে পারে।
গত বছর ইনার মঙ্গোলিয়ায় মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে মঙ্গোলিয়ান ভাষার পাশাপাশি চীনা ভাষা রাখায় চীনা কর্তৃপক্ষ বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। এতে মঙ্গোলিয়ার মানুষ নানাভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে।
ধারণা করা হচ্ছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং তিব্বত, পূর্ব তুর্কিস্তান ও ইনার মঙ্গোলিয়ায় চীনা মতাদর্শ চাপানোর ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ বাড়াতে পারেন। এর প্রাথমিক ধাপ হিসেবে চীনের সংবিধান থেকে আদিবাসীদের ভাষার অধিকার সংরক্ষণের ধারাগুলো বাতিল করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চীনের ভাষা শিক্ষার অ্যাপ টকমেট এবং অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট বিলিবিলি থেকে গত মাসে তিব্বতি ও উইঘুর ভাষা মুছে ফেলা হয়েছে।
জাপানের শিজুকা ইউনিভার্সিটির সাংস্কৃতিক প্রত্নবিজ্ঞানী ইয়াং হাইয়িং মনে করছেন, চীন সরকার তিব্বত বা ইনার মঙ্গোলিয়ার মতো স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ডগুলোকে শিগগিরই নিজের অভিন্ন প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করতে চাইছে। তার প্রস্তুতি হিসেবে এসব এলাকার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করতে তারা পরিকল্পনা হাতে নিয়ে থাকতে পারে।