হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার পর নেপাল-তিব্বত সীমান্তের চীনা অংশে ২৩টি দেশের অন্তত ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। একই ঘটনায় চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। রোববার (৩০ আগস্ট) তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কর্মকর্তারা এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
চীনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০৪ জন নেপালের নাগরিক। এছাড়া ৪৯ জন ভারতীয়, ৩৩ জন লাটভিয়ার, ১৮ জন যুক্তরাষ্ট্রের এবং ১৫ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিক রয়েছেন। অন্যান্য দেশের নাগরিক মিলিয়ে মোট ২৩টি দেশের মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট বিদেশি দূতাবাসগুলোকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে বেইজিং।
গত বুধবার একটি হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত হিমালয়ের বিভিন্ন নদী দিয়ে নেমে আসার পর এ দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর এই প্রথম নিখোঁজ বিদেশিদের জাতীয়তাভিত্তিক হিসাব প্রকাশ করল চীন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তিব্বতের জিরং কাউন্টিতে ১৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
সীমান্তের অপর পাশে নেপালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৬৭৫ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪৯৮ জন এবং ৭ হাজার ৫১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েক ঘণ্টায় ত্রিশূলী নদীর পানি আবারও বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের উঁচু স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতাই এ দুর্যোগের অন্যতম প্রধান কারণ।
সিসিটিভি একে তিব্বত মালভূমির ‘হিমমণ্ডলীয় দুর্যোগের নতুন ও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
চীনা বিজ্ঞানীদের গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালের দিক থেকে নেমে আসা ভূমিধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত মাত্র ছয় থেকে সাত মিনিটের মধ্যে জিরং সীমান্ত চৌকিতে পৌঁছে যায়।
সীমান্ত ক্রসিংয়ের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে প্রবল পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ভবন ভেসে যেতে এবং মানুষকে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতে দেখা গেছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই শনিবার নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এ সময় তিনি ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দুই দেশের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন ও জটিল হয়ে উঠেছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় চীন ইতোমধ্যে ২ হাজার ১০০ জনের বেশি জরুরি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, নেপালকে জরুরি নগদ সহায়তা, দুর্যোগ ত্রাণসামগ্রী, স্যাটেলাইট ও জলবিজ্ঞানসংক্রান্ত তথ্য এবং সুড়ঙ্গ উদ্ধার বিশেষজ্ঞ সরবরাহ করছে বেইজিং।
নিখোঁজ নাগরিকদের শনাক্ত করা, দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় চীন ও নেপাল যৌথভাবে কাজ করছে বলেও জানিয়েছে সিসিটিভি।
রেড ক্রসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভয়াবহ এই দুর্যোগে ৯০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন।
সূত্র: রয়টার্স
ডিবিসি/এমএনকে