গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, রবিবার তার ১০০ দিন পূর্ণ হলো। একদিকে যেমন যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে তেমনি বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষও অব্যাহত রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের কাছে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য প্রবল রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারির ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হন। জবাবে ইরান ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পাশাপাশি জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। গত এপ্রিলের শুরুতে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে এখনো মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি রেখেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে হামলার বিরোধী ছিলেন, যে চিত্র এখনো বদলায়নি। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও উন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক শিবলি তেলহামির মতে, খুব কম মার্কিন নাগরিকই মনে করেন যে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো লাভ হচ্ছে। সম্প্রতি মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্রিটিক্যাল ইস্যুজ পোল’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৬ শতাংশ ভোটার মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জিতবে বা ইতিমধ্যে জিতেছে। অন্যদিকে, ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের (আইজিএ) জরিপ বলছে, ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার নীতি সমর্থন করেন না এবং ৭৯ শতাংশ ভোটার মনে করেন এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন খরচের ওপর পড়ায় বিষয়টি এখন কেবল পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির অংশে পরিণত হয়েছে।
অর্থনৈতিক এই নেতিবাচক প্রভাব ও যুদ্ধের অজনপ্রিয়তা আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৩৩ শতাংশ রিপাবলিকান ভোটারও মনে করেন এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবই বেশি। ডেমোক্রেটিক পার্টি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আশা করছে। অধ্যাপক তেলহামি মনে করেন, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পকে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে, এমনকি তিনি অভিশংসনের মুখেও পড়তে পারেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে বরাবরই খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার বৃহত্তর লক্ষ্যের কাছে এই সাময়িক অর্থনৈতিক কষ্ট খুবই সামান্য। ট্রাম্প প্রকাশ্যে এমন অনমনীয় মনোভাব দেখালেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনীতি তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ নিয়ে তিনি ভেতরে-ভেতরে উদ্বিগ্ন। তা ছাড়া, অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধে যাওয়ার আগে যেভাবে দীর্ঘ প্রচারণার মাধ্যমে জনগণের সমর্থন আদায় করতেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ অভাব ছিল। কংগ্রেসে বিষয়টি উপস্থাপন না করেই তিনি এমন এক যুদ্ধে জড়িয়েছেন, যা দেশের সাধারণ নাগরিকদের কাছে অপ্রয়োজনীয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা
ডিবিসি/এফএইচআর