চারদিকে শুধু থইথই পানি। ঘরের চুলায় বহুদিন আগেই আগুন নিভে গেছে। হাঁড়িতে চাল নেই, নেই রান্না করার মতো কোনো খাবারও। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর নিয়ে বন্যার পানিতে ডুবে থাকা ঘরে একা দিন কাটাচ্ছেন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাকালুকি হাওরপাড়ের বাসিন্দা বৃদ্ধা রুফিয়া বেগম। টানা ১৫ দিন ধরে পানিবন্দি থাকলেও তাঁর ভাগ্যে মেলেনি কোনো সরকারি সহায়তা। চরম অভাব-অনটনের মধ্যে অনাহারে রোজা রেখে দিন পার করছেন অসহায় এই বৃদ্ধা।
জুড়ী উপজেলার বেলাগাঁও হাকালুকি হাওরপাড় এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধা রুফিয়া বেগমের ছোট্ট বসতঘরটি এখনো বন্যার পানিতে ঘেরা। শুধু রুফিয়া বেগমই নন, তাঁর আশপাশের অধিকাংশ পরিবারই এখন পানিবন্দি। চলাচলের একমাত্র ভরসা নৌকা। তীব্র খাদ্যসংকটে এলাকার অনেকেই এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
নিজের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রুফিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘বাড়ির চারপাশে শুধু পানি। ঘরে একমুঠো চালও নেই, রান্না করার মতোও কিছু নেই। প্রায় ১৫ দিন ধরে অনেক কষ্টে আছি। কখনো না খেয়ে, কখনো শুধু পানি খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। রোজা রেখেছি, কিন্তু ইফতার করার মতোও কিছু নেই।’
পারিবারিক অসহায়ত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে থেকেও নেই, আমার কোনো খোঁজ নেয় না। পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, তাদের অবস্থাও ভালো না। একজনের স্বামী মারা গেছেন। নিজের অভাবের কারণে মেয়েদের কাছেও যেতে পারি না, যাওয়ার ভাড়াটুকু পর্যন্ত জোগাড় করতে পারছি না।’
জনপ্রতিনিধিদের উদাসীনতার অভিযোগ এনে রুফিয়া বেগম বলেন, ‘চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে অনেকবার গেছি। সরকারি সাহায্য কিংবা বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্যও বলেছি। কিন্তু কেউ আমার কথা শোনেনি, কেউ খোঁজও নেয়নি।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাকালুকি হাওরপাড়ের বন্যাকবলিত এলাকায় রুফিয়া বেগমের মতো আরও অনেক অসহায় মানুষ রয়েছেন, যারা এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ বা সহায়তা পাননি। বিশেষ করে একাকী বসবাসকারী বয়স্ক মানুষদের দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে।
হতাশা ও আকুতিভরা কণ্ঠে বৃদ্ধা রুফিয়া বেগম সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, ‘এই বয়সে এসে কি না খেয়েই মরতে হবে? কেউ যদি একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত, তাহলে হয়তো বেঁচে থাকার সাহস পেতাম।’
এলাকায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও রুফিয়া বেগমের মতো অসহায় মানুষের জীবন থেকে দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। ভুক্তভোগীদের আশা, দ্রুত সরকারি ও সামাজিক সহায়তা পৌঁছালে অন্তত ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তার এই কঠিন সময় কিছুটা হলেও লাঘব হবে।
ডিবিসি/এমএনকে