আন্তর্জাতিক

২০৫০ সালের মধ্যে সুপেয় পানির অভাবে পড়বে বাংলাদেশ

ফাহিমা সারোয়ার সূফল

ডিবিসি নিউজ

৩ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তাপমাত্রা, যার সরাসরি আঘাত এসে পড়েছে পৃথিবীর সুপেয় পানির উৎসগুলোর ওপর। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট ইমেজের বরাতে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র, যেখানে দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর ১০টি গুরুত্বপূর্ণ হ্রদ, নদী ও কৃত্রিম জলাধার ক্রমাগত শুকিয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৩২৪ ট্রিলিয়ন লিটার সুপেয় পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, যা দিয়ে বছরে প্রায় ২৮ কোটি মানুষের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল। বিজ্ঞানের ভাষায় ‘মহাদেশীয় শুষ্কতা’ নামের এই সংকটের মূল কারণ লাগাতার খরা এবং পানি ও ভূমির অপরিকল্পিত, অটেকসই ব্যবহার। স্যাটেলাইটের চোখে ধরা পড়া এই পরিবর্তনগুলো প্রমাণ করছে যে, মানবসভ্যতা এখন এক গভীর পানি সংকটের মুখোমুখি।


স্যাটেলাইট চিত্রে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম প্রধান দুটি পানির উৎসের মারাত্মক বিপর্যয় দেখা গেছে। আমাজনের পর দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী ‘পারানা’, যা ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনার বাণিজ্য এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস, তা দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে শুকিয়ে চর ও নতুন দ্বীপে পরিণত হয়েছে। এর ফলে আর্জেন্টিনার রোজারিও বন্দরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং ইতাইপু বাঁধের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে।

 

অন্যদিকে, বলিভিয়ার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে অবস্থিত একসময়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম হ্রদ ‘লেক পোপো’ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পানির গতিপথ পরিবর্তনের কারণে এখন সম্পূর্ণ বিলুপ্তপ্রায় এক লবণাক্ত সমভূমি, যা স্থানীয় আদিবাসী উরু সম্প্রদায়ের জীবিকা ধ্বংস করে দিয়েছে। একই রকম করুণ দশা চিলির রাজধানী সান্টিয়াগোর কাছের ‘লাগুনা দে আকুলেয়ো’ লেকটির; একসময়ের জনপ্রিয় এই বিনোদন কেন্দ্রটি কয়েক দশকের খরায় এখন পুরোপুরি উধাও।


মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার অঞ্চলেও পানির উৎসগুলোর সংকোচন চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ইরানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একসময়ের মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম লবণাক্ত পানির হ্রদ ‘লেক উর্মিয়া’ ১৯৯০ সালের ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তন থেকে লাগাতার খরা ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে বর্তমানে মাত্র ৫৮১ বর্গকিলোমিটারে এসে ঠেকেছে। পাশাপাশি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে উজবেকিস্তানের ‘দক্ষিণ আরাল সাগর’, যা গত কয়েক দশকে ৯০ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত হয়ে এখন ধুলোবালি ও লবণাক্ত মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

 

তবে এর মধ্যেও কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে ইরাকের ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী ‘আল-চিবাশ জলাভূমি’। আশির দশকের তুলনায় এটি মারাত্মকভাবে শুকিয়ে গেলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাত এবং কৃত্রিম পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার ফলে এর কিছু অংশে পুনরায় প্রাণ ফিরে এসেছে।


আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কার, মালি ও বতসোয়ানার স্যাটেলাইট চিত্রগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের এক নির্মম দলিল। মাদাগাস্কারের দক্ষিণাঞ্চলের ‘আম্বোভম্বে’ শহরটি বছরের পর বছর ধরে খরা ও তীব্র তাপমাত্রার কারণে লাল বালুঝড়ের কবলে পড়েছে, যার ফলে চাষাবাদ ধ্বংস হওয়ায় বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

 

সাহারা মরুভূমির প্রান্তে অবস্থিত মালির ‘লেক ফাগুইবাইন’ গত কয়েক দশকে প্রকৃতি থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। এছাড়া, বতসোয়ানার ‘লেক এনগামি’ তীব্র খরা ও উজানের পানি কমে যাওয়ায় এক পর্যায়ে পুরোপুরি শুকিয়ে উর্বর মাছ ধরার এলাকা থেকে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছিল, যদিও পরবর্তী সময়ে এটির আংশিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে।


এই বৈশ্বিক জলবায়ু বিপর্যয় ও সুপেয় পানির সংকটের ভয়াবহ প্রভাব থেকে কোনোভাবেই মুক্ত নয় বাংলাদেশ। হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং উজানের দেশগুলো কর্তৃক একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীগুলোর পানির স্তর শুষ্ক মৌসুমে আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। 

 

একদিকে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর নিচে নেমে যাওয়ায় তীব্র খরা ও মরুপ্রক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল এলাকাজুড়ে সুপেয় পানির উৎসগুলোতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের উপকূলীয় ও বরেন্দ্র অঞ্চলে সুপেয় পানির চরম হাহাকার তৈরি হবে, যা কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি কোটি কোটি মানুষকে তীব্র পানি সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।


পানির এই ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্ত নয় উন্নত বিশ্বও। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদীতে কৃত্রিমভাবে তৈরি দেশের বৃহত্তম জলাধার ‘লেক মিড’ কয়েক দশকের খরা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত পানির চাহিদার কারণে আশঙ্কাজনকভাবে শুকিয়ে গেছে। এই জলাধারের পানির স্তর কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও মেক্সিকোর লাখ লাখ মানুষ এখন চরম পানি সংকটের মুখে পড়েছেন। 

 

বিশ্বজুড়ে স্যাটেলাইটের এই ১০টি ভিন্ন ভিন্ন চিত্র মূলত একটি একক এবং জরুরি বার্তাই দিচ্ছে পৃথিবীর সুপেয় পানির উৎসগুলোকে বাঁচাতে এখনই যদি বৈশ্বিক পর্যায় থেকে টেকসই পদক্ষেপ এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই পানির সংকট মানবজাতির অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলবে।

 

ডিবিসি/টিবিএ

আরও পড়ুন