দীর্ঘ স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পর রাষ্ট্রের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের স্বাধীন ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতে একটি ঐক্যবদ্ধ সম্পাদকীয় প্ল্যাটফর্ম গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের ৩৪ জন সম্পাদক। গণমাধ্যমকে সব ধরনের রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাবমুক্ত করে ভয়হীন সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি এবং দমনমূলক আইন বাতিলের লক্ষ্যে তারা এই যৌথ বিবৃতি প্রদান করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় মুক্ত সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতে যে প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক বলয় তৈরি করা হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। সরকারি বিধিনিষেধ এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে সত্য প্রকাশে বিরত থাকার বা ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’এর যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে সম্পাদকদের সমষ্টিগত ও দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন। জনগণের জানার অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে একটি শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানই পারে সংবাদকক্ষগুলোকে নির্ভীক সাংবাদিকতায় ফিরিয়ে আনতে। ফ্যাসিবাদী আমলে গণমাধ্যমের মালিকানা নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হাতে চলে গিয়েছিল, যারা সাংবাদিকতাকে নিজেদের স্বার্থরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফ্যাসিবাদ পরবর্তী সময়ে এই করপোরেট ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পাদকীয় নীতিকে মুক্ত করাকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, সম্পাদকদের একটি শক্তিশালী ও আপসহীন ঐক্য থাকলে মালিকপক্ষের অন্যায্য হস্তক্ষেপ, ব্যবসায়িক চাপ এবং সরকার ও বিভিন্ন প্রেশার গ্রুপের অন্যায্য চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া, দমনমূলক আইন যেমন সাইবার নিরাপত্তা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের সংস্কার বা পূর্ণাঙ্গ বিলোপ নিশ্চিত করতে সব ধারার সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সম্মিলিত ও নিয়মতান্ত্রিক চাপের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শুধু অধিকার আদায় নয়, নিজেদের আত্মশুদ্ধি এবং বৈশ্বিক নীতি ও নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ধারণের মাধ্যমে গণমাধ্যম যেন নিজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে, সে বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে বিভিন্ন সংকটকালে সম্পাদকদের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের স্বার্থে এবং গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে বাংলাদেশের সম্পাদকদের এই ঐক্য শুধু একটি জোট নয়, বরং এটি হবে মুক্ত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের এক অপরিহার্য ‘নিরাপত্তা প্রাচীর’। রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে থেকে সব গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্বকারী এই প্ল্যাটফর্ম গঠনে অচিরেই সাংগঠনিক উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং অনৈক্য ও সংকীর্ণতার সব দেয়াল তুলে দিয়ে গণমাধ্যমের সব সম্পাদককে এক কাফেলায় শামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
যৌথ এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন- যায়যায় দিন এর শফিক রেহমান, আমার দেশ-এর মাহমুদুর রহমান, নয়াদিগন্ত-এর সালাহ উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর, যুগান্তর-এর আবদুল হাই শিকদার, বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর আবু তাহের, প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর মারুফ কামাল খান সোহেল, কালের কণ্ঠ-এর হাসান হাফিজ, সংগ্রাম-এর আযম মীর শহীদুল আহসান, নিউনেশন-এর মোকাররম হোসেন, ওয়াদা-এর শফিকুল আলম, বাংলাদেশের খবর-এর সৈয়দ মেসবাহ উদ্দীন, ডেইলি সান-এর রেজাউল করীম লোটাস, খবরের কাগজ-এর মোস্তফা কামাল, ভোরের ডাক-এর বেলায়েত হোসেন, জনতা-এর ওবায়দুর রহমান শাহীন, মানবকণ্ঠ-এর শহীদুল ইসলাম, রূপালী বাংলাদেশ-এর মো. সায়েম ফারুকী, খোলা কাগজ-এর মনির হোসেন, টাইমস অফ বাংলাদেশ-এর ইলিয়াস খান, বাংলাবাজার পত্রিকা-এর মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব, খবর সংযোগ-এর শেখ নজরুল ইসলাম, ক্যাপিটাল নিউজ-এর আবুল কাশেম মজুমদার, খবরপত্র-এর ব্যারিস্টার মো. মারুফ ইব্রাহীম আকাশ, নওরোজ-এর শামসুল হক দুররানি, গণমুক্তি-এর শাহাদাত হোসেন শাহীন, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী-এর আফসার উদ্দিন চৌধুরী, রাজশাহীর নতুন প্রভাত-এর সোহেল মাহবুব, খুলনার অনির্বাণ-এর মাহবুবা পারভিন, যশোরের লোকসমাজ-এর শান্তনু ইসলাম সুমিত, রংপুরের দাবানল-এর খন্দকার মোস্তফা সরোয়ার অনু, যুগের আলো-এর মমতাজ শিরিন ভরসা, খুলনার প্রবাহ-এর আশরাফুল হক, সিলেটের জালালাবাদ-এর মুকতাবিস উন নূর এবং ময়মনসিংহের নিউ টাইমস-এর সাইফুল ইসলাম।
ডিবিসি/ এইচএপি