বুকসমান কাদা। চারপাশে শুধু কাদা আর কাদা। সেই কাদার মধ্যেই গাছের সঙ্গে বাঁধা ৪টি মহিষ। নড়াচড়া করারও যেন সুযোগ নেই তাদের। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা। বৃষ্টি ও পায়ের খুরের চাপে জমে থাকা মাটি পরিণত হয়েছে বুকসমান কাদায়। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আর অসহায় চোখে পথচারীদের দিকে তাকিয়ে থেকে এভাবেই কেটে গেছে প্রায় তিন মাস।
মহিষগুলোর এই করুণ দৃশ্য দেখে কষ্ট পেয়েছেন গ্রামের মানুষও। কেউ কাছে গিয়ে তাদের মুক্ত করতে পারেননি, আবার মালিককে বলেও কোনো ফল হয়নি। অবশেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাজ্জাদ হোসেনের হস্তক্ষেপে কাদায় বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছে মহিষ ৪টি।
ঘটনাটি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গোকুলনগর গ্রামের। মহিষগুলোর মালিক ওই গ্রামের মৃত ফরজ আলীর ছেলে আব্দুল আলিম।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ৩ মাস আগে পর্যন্ত আব্দুল আলিম মহিষগুলোকে মাঠে চরাতে নিয়ে যেতেন। এরপর বাড়ির পাশের চারটি গাছের সঙ্গে একে একে বেঁধে রেখে দেন। সেই থেকে আর মাঠে নেওয়া হয়নি মহিষগুলোকে। বাড়ির লোকজন সামান্য খড় ও পানি দিলেও তাদের চলাফেরার কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
একই জায়গায় দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে ও বসে থাকতে থাকতে মহিষগুলোর পায়ের নিচের মাটি নরম হয়ে গভীর কাদায় পরিণত হয়। একসময় সেই কাদা তাদের বুকসমান হয়ে যায়। কাদার মধ্যেই বাঁধা অবস্থায় কাটতে থাকে তাদের জীবন।
পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে মহিষগুলো নীরবে তাকিয়ে থাকত। চোখে যেন ছিল মুক্তির আকুতি। কিন্তু কথা বলতে না পারা এই প্রাণীগুলোর কষ্ট বোঝানোর কোনো ভাষা ছিল না। গ্রামের মানুষ সেই দৃশ্য দেখে কষ্ট পেলেও দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা হয়নি।
আব্দুল আলিমের কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলে তার মা সত্য খাতুন বলেন, আমরা এভাবে প্রাণীগুলোকে কষ্ট না দিয়ে বিক্রি করে দিতে বলেছি। কিন্তু আলিম আমাদের কথা শোনেনি। আমরা ভয়ে ওদের কাছে যেতে পারি না। তাই ওখানেই বাঁধা ছিল।
রবিবার (১৬ আগস্ট) সেই অসহায় মহিষগুলোর করুণ অবস্থার ছবি দেখে আর চুপ থাকতে পারেননি স্থানীয় পরিবেশকর্মী নাজমুল হোসেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর পোস্ট নজরে আসে মহেশপুর উপজেলা প্রশাসনের।
পরে রবিবার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যার পরই ঘটনাস্থলে ছুটে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন। সেখানে গিয়ে তিনি মহিষগুলোর অবস্থা দেখেন। তবে এ সময় মহিষগুলোর মালিক আব্দুল আলিমকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। পরে ইউএনও-র হস্তক্ষেপে গাছের সঙ্গে বাঁধা মহিষ ৪টিকে কাদার বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা হয়। দীর্ঘদিন পর তারা ফিরে পায় একটু নড়াচড়ার সুযোগ।
পরিবেশকর্মী নাজমুল হোসেন বলেন, গ্রামের মানুষও প্রাণীগুলোর কষ্ট দেখে কষ্ট পেত। কিন্তু আব্দুল আলিম মহিষগুলোকে ওই কাদা থেকে বের করেননি। আজ তাদের অবস্থা দেখে আমি ফেসবুকে পোস্ট করি। বিষয়টি নজরে আসার পর মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন ঘটনাস্থলে এসে মহিষগুলোকে অবমুক্ত করেন।
মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, সন্ধ্যায় ওই এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে ৪টি মহিষ কাদা থেকে বের করে আনা হয়। এরপর সেগুলোকে মোটামুটি একটি ছাউনির নিচে রাখা হয়েছে। পরিবারকে মহিষগুলোর জন্য নিরাপদ জায়গা ও পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রাণীগুলোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে তাদের। ৩ মাসের কাদামাখা বন্দিজীবনের পর মহিষ ৪টি এখন মুক্ত।
তিনি আরও বলেন, মহিষের মালিক কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় তাকে জরিমানার আওতায় আনা হয়নি। পরিবার এবং এলাকাবাসীকে ১৫ দিনের মধ্যে এদের জন্য ভালো জায়গার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। তারা এটি করতে না পারলে পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।
ডিবিসি/এসভিএন