সরকার সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আটক ৮০০ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ এবং উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর বিরামহীন কূটনৈতিক তৎপরতার মুখে পিছু হটেছে তেহরান।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউস এ তথ্য নিশ্চিত করে।
এর আগে বিক্ষোভ দমনে ইরানের চরম দমন-পীড়নের জেরে ওয়াশিংটন সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিলেও, উপসাগরীয় মিত্রদের অনুরোধে আপাতত সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত সপ্তাহে ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কেঁপে উঠেছিল। যদিও সপ্তাহব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং কঠোর দমন-পীড়নের ফলে গত কয়েকদিনে বিক্ষোভের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। নরওয়ে-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা 'ইরান হিউম্যান রাইটস' (আইএইচআর) জানিয়েছে, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ৩,৪২৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন এবং প্রকৃত নিহতের সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি বিক্ষোভে একজন কানাডিয়ান নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে কানাডা সরকার।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট সাংবাদিকদের জানান, গতকাল নির্ধারিত ৮০০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বিক্ষোভকারীদের হত্যা অব্যাহত থাকলে তেহরানকে "মারাত্মক পরিণতি" ভোগ করতে হবে বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই সতর্ক করেছিলেন। যদিও আপাতত সামরিক হামলা স্থগিত করা হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে সৌদি আরব, কাতার এবং ওমান শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পকে শান্ত করার জন্য ব্যাপক তৎপরতা চালায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সৌদি কর্মকর্তা জানান, ইরানকে 'ভালো উদ্দেশ্য' প্রমাণের সুযোগ দিতে উপসাগরীয় এই তিন দেশ ট্রাম্পকে রাজি করাতে দীর্ঘ ও উন্মত্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এছাড়া সৌদি আরব স্পষ্ট জানিয়েছে, ইরানে হামলার জন্য তারা তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না।
এদিকে, মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার আগে থেকেই উত্তেজনা তুঙ্গে ছিল। বিশেষ করে ২৬ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানির ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল, যাকে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে বৃহস্পতিবার ইরানের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, সোলতানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি, বরং তার বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রচারণার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। মার্কিন নেটওয়ার্ক ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও নিশ্চিত করেছেন, আজ বা কাল কোনো ফাঁসি হবে না।
কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা যেকোনো বিদেশী হুমকির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করবে। তবে পরিস্থিতি শান্ত করতে সুইজারল্যান্ডও মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।
তেহরানের পরিস্থিতি এখন কিছুটা শান্ত দাবি করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেন, সরকার এখন "পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে" রয়েছে। তবে ইন্টারনেটের ধীরগতির মধ্যেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কাহরিজাক মর্গে লাশের সারি এবং ইলাম প্রদেশে জানাজার মিছিলে খামেনিবিরোধী স্লোগানের দৃশ্য দেখা গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতারই ইঙ্গিত দেয়।