‘এইভাবে চিকিৎসা চলতে থাকলে এরা আমাকে মেরে ফেলবে। আমি আর বাঁচব না, দয়া করে আমাকে বাঁচান, আমার প্রাণ ঝুঁকিতে রয়েছে’ মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে এক ভিডিওতে নিজের মাকে কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই আকুতি জানিয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী প্রসূতি কল্পনা মিশ্র। মধ্যপ্রদেশের রেওয়ার একটি সরকারি হাসপাতালে প্রথম সন্তানের জন্ম দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কল্পনা ও তাঁর নবজাতক সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে হাসপাতালের চরম অবহেলার অভিযোগ তুলেছে পরিবার, যদিও কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার কোনো গাফিলতির কথা অস্বীকার করেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে রেওয়ার সঞ্জয় গান্ধী-গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে। হাতওয়ার বাসিন্দা কল্পনা মিশ্রকে প্রসবের জন্য গত ২৫ আগস্ট রাতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন ২৬ আগস্ট রাত সাড়ে ৮টার দিকে অস্ত্রোপচারের (সিজারিয়ান সেকশন) মাধ্যমে তিনি একটি সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু সন্তান প্রসবের কিছুক্ষণের মধ্যেই মা ও নবজাতক উভয়েরই মৃত্যু হয়। কল্পনার কাকা ধর্মেন্দ্র মিশ্র জানান, প্রসববেদনা চলাকালে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে এবং বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পূর্বে ধারণ করা একটি ভিডিও ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডের ভেতর কল্পনা চরম আতঙ্কে চিৎকার করছেন এবং কান্নাকাটি করে পরিবারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কর্তব্যরত নার্সরা তাঁকে থামানোর চেষ্টা করছেন এবং এক পর্যায়ে এক নার্সকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন?’ কিন্তু কল্পনা কোনোমতে এগিয়ে গিয়ে পরিবারের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ করেন।
কল্পনার বাবা রামশরণ মিশ্রের অভিযোগ, মেয়ের অবস্থার অবনতি হলে বারবার চিকিৎসকদের দেখার অনুরোধ করলেও কেউ বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়াই কল্পনার মৃত্যুর কারণ বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মেয়েকে বিয়ের জন্য তিনি ১৫ লাখ টাকার জমি বিক্রি করেছিলেন এবং তিনি তাঁর একমাত্র সন্তান ছিলেন। এ ছাড়া পরিবারের পক্ষ থেকে অ্যানেসথেসিয়ার অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার জোরালো সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, কারণ অস্ত্রোপচারের পর কল্পনার জ্ঞান আর ফেরেনি। তাঁরা দায়ীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের ও বরখাস্তের দাবি জানান।
মা ও শিশুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্বজনরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং প্রায় চার ঘণ্টা ধরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ডিন ডা. সুনীল আগরওয়াল ও হাসপাতাল সুপার ডা. রাহুল মিশ্র পরিবারের সাথে প্রায় দুই ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। পরে জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকদের দিয়ে ময়নাতদন্ত করানোর সিদ্ধান্তে পরিবার সম্মত হয়। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে কর্তব্যরত দুই নার্সিং অফিসার সাধনা বর্মা ও সীমা মুজালদেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং ঘটনার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
হাসপাতালের ডিন ডা. সুনীল আগরওয়াল ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে জানান, রোগীর জ্ঞান কেন ফেরেনি তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে হাসপাতালের সুপার ডা. রাহুল মিশ্র চিকিৎসকদের গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, চিকিৎসা নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনেই করা হয়েছিল।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি মধ্যপ্রদেশের স্বাস্থ্য খাতের তীব্র চিকিৎসক সংকটের বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে। ২০২৫-২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুসারে, রাজ্যটিতে অনুমোদিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ৭২ শতাংশেরও বেশি পদ খালি রয়েছে; যেখানে ৫,৪৪৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১,৪৯৫ জন। পাশাপাশি ৬,৫১৩টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে ২,৬৮৯টি পদই বর্তমানে শূন্য।
সূত্র: এনডিটিভি