আজ সকালবেলা উঠে দেখি ঘরটা ঝাপসা। না, জানালায় কুয়াশা নেই, আমার চোখই অশ্রুসিক্ত। কারণ? কারণ নেই। বেদনা আছে তাই। মনভূমিতে শীতের শুকনো পাতার মতই পড়ে আছে একরাশ হাহাকার।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় টোকা।
খুলে দেখি, সামনে দাঁড়িয়ে বাংলা সাহিত্যের সাত কাণ্ডারী — সাত মহারথী — সাতজন বাঘা-বাঘা সাহিত্যিক।
কারো চোখে ভাব, কারো গলায় বিদ্রূপ, তারা যেন আমার দুঃখকে গবেষণার বিষয় বানাতে এসেছে!
* প্রথমে প্রবেশ করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পেছনে পিয়ানো বাজে। তিনি একখানি সুদীর্ঘ চোখে তাকিয়ে বললেন—
“তুমি দুঃখিত? আহা, বেশ!
দুঃখ না থাকিলে কাব্য আসে না।
তোমার এই ক্লান্তি, এই বিষাদতা —
এর হবে একদিন শেষ।
তিনি বললেন, আরে- আমি তো গোটা জীবনটাই বসে বসে দুঃখ নিয়ে গানের খাতা ভরেছি। তবে
তুমি কেন দুঃখ করবে না, হে সখা?”
আমি কাঁদতে কাঁদতে বলতে গেলাম কিছু,
কিন্তু হায়! তিনি ইতোমধ্যে দুঃখকে ভরে দিয়েছেন ছন্দে আর সুরে। আমার দুঃখ নিয়ে তিনি তাঁর নতুন ‘গীতবিতান’ বানাতে উদ্যত!
তারপর এলেন কাজী নজরুল ইসলাম-
ঝড়ের মতো এলেন, বজ্রের মতো গলা —
“কে রে কাঁদে কে রে?
তোর সব দুঃখ ফেল ঝেড়ে!”
আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে, তিনি আমাকে বোঝান, “আমি বিদ্রোহ করেছি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে, আর তুমি কাঁদছো জীবনের বিরুদ্ধে?”
তারপর তিনি নিজের লেখা “কারার ঐ লৌহকপাট” কবিতার তিন লাইন গর্জন করে শুনিয়ে বললেন—
— “চল্, উঠ্! দুঃখকে কষে দে এক ঘুঁষি!”
তিনি শান্তনা দিতে নয়, বিপ্লব ঘটাতে এসেছেন, হঠাৎ এটা আমি বুঝি!
তৃতীয়তে এলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-
পরনে ধুতি, হাতে তামাক, মুখে এক রহস্যময় হালকা বিষণ্ন হাসি। তিনি বসে বললেন,
— “জীবন মানেই দুঃখ। সুখ শুধু পাতলা চায়ের মতো — গন্ধ আছে, স্বাদ নেই।
আমার ‘দেবদাস’ পড়ো। দেখবে, তোমার কষ্ট আসলে তেমন কিছুই নয়।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম— “আপনি কি দেবদাসের শেষ দেখে শোক পেয়েছিলেন?
তিনি ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, “আমি শুধু লেখক। পাঠক কাঁদলে সেটাই আমার সাফল্য।”
তখন আমি একটু কেঁদে ফেললাম —তার সাহিত্যের স্বার্থে!
এরপর এলেন সুকুমার রায়-
তাঁর হাতে একখানা ‘পাগলা দাশুর মানসিক ডাক্তারি বই’। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“তুমি কি বুঝতে পারো না, দুঃখ একধরনের ‘গম্ভীর বাতিক’?
এটা হলে ‘অকারণে মনখারাপ’ রোগ হয়!
তাই আমি বলি—
‘হাসতে নেই মানা,
হাসো শয়নে, হাসো স্বপনে,
হাসো ফ্রাইপ্যানে ভাজা কুমড়ো খেতে খেতে!’”
আমি কিছুটা বিরক্ত হই, তবু একটুখানি হেসে ফেলি — কারণ পাগলামিতেও যুক্তি ছিল।
পঞ্চমে এলেন বুদ্ধদেব বসু— তিনি দুঃখের ভেতরেও প্রেমের গন্ধ খুঁজে বললেন— “তুমি তো আসল কষ্ট পাওইনি, কারণ তুমি প্রেমে পড়ো নি।” আমি বললাম— “আচ্ছা, আমি প্রেমে পড়লে কী হতো?” তিনি উত্তর দিলেন—
— “তোমার কষ্ট আর মুগ্ধতা একসাথে কবিতায় গলে যেতো।” অর্থাৎ, বুদ্ধদেবদা চাইলেন আমার কষ্ট থেকে তিনি একটা কবিতা লেখার মালমশলা বানিয়ে নিতে!
ষষ্ঠে এলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-
তিনি এসে বললেন—“তোমার দুঃখকে রাতের ট্রামের মতো দেখো।
শহরের রাস্তা দিয়ে চলছে , আলো-আঁধারিতে মিলিয়ে যাচ্ছে।
দুঃখ স্থায়ী কিছু নয়।”
আমি বললাম— “তাহলে আমার কান্না কেন এত বেদনাময়?” তিনি বললেন— “তোমার কান্না একটা কবিতার প্রাক-কথা, সেটাকেই গল্প করো।”
আমি ভাবি, আহা, সুনীলদাও আমার দুঃখে সাহিত্য খুঁজে ফিরলেন!
শেষে এলেন হুমায়ূন আহমেদ—
তিনি হালকা হাসি দিয়ে বললেন—
— “তোমার এই দুঃখ দেখে মনে হচ্ছে, এখন একটা বৃষ্টির দরকার। আর একটা অলস দুপুর, কিছু ভিজে চপ, ও একখানা ‘হিমু’।” তিনি এক কাপ চা হাতে দিলেন,
আর বললেন—“চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আর যদি ঠিক না হয়, তাহলে সেটা গল্পের ক্লাইম্যাক্স।”
আমি বললাম— “তাহলে আপনি কি আমার পরো জীবনটাকেই উপন্যাস ভাবছেন?” তিনি মৃদু হেসে বললেন—
“সকল দুখের শেষেই এক বর্ণীল বিকেল আসে।”
শেষমেষ? হিসেব কষে দেখলাম -
সাহিত্যের সাত জাদুকর এসে আমার দুঃখকে তুলে নিয়ে গেছেন তাঁদের নিজস্ব ভাণ্ডারে। কেউ তা ছন্দে বাঁধলেন, কেউ কাব্যে, কেউ বিদ্রোহে, কেউ বৃষ্টিতে।
আর আমি? আমি বসে বসে ভাবি — এই দুঃখটাই তো আমার সবচেয়ে বড় অর্জন, কারণ এতগুলো সাহিত্যিক আজ আমায় দেখতে এলেন শুধুই এই “বেদনা”র কারণে!
শেষপাতে-উপসংহার: বেদনা থাকুক।
কিন্তু বেদনা থাকুক এমনভাবে—
যাতে সাহিত্য এসে দরজায় টোকা দেয়,
আর আমার দুঃখের দিনে, আমার প্রিয় নিন্দুকেরা যেন একটুখানি হেসে ওঠার সুযোগ না পায়। হা হা হা