হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতীতের কিছু স্মৃতি রোমন্থন করলেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন খান। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে মঙ্গলবার (১০ অক্টোবর) পর পর চারটি পোস্ট দিয়েছেন তিনি, শেয়ার করেছেন হুমায়ুন আহমেদের পাঠানো ডিভোর্স নোটিশ।
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদেকে ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিলেন গুলতেকিন খান। বিয়ের ৩ দশক পর দু’জনের দু’টি পথ দু’টি দিকে বেঁকে যায়; বিচ্ছেদ হয়ে যায় এ দম্পতির। এরপর জল গড়িয়েছে অনেক দূর। তবু চাওয়া-পাওয়া, জীবনের নানা হিসেব যাদের একটা সময় পর্যন্ত একই ছিল, বিনিসুতোয় বাঁধা সে সম্পর্ক কি ভোলা যায়!
হুমায়ূন আহমেদ ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছেন বহুদূর। এরপর বহু পথ হাঁটতে হয়েছে গুলতেকিনকে। জীবনে চলার পথ থেমে নেই তার। হয়তো এ চলার পথে কখনও কখনও তাই প্রচণ্ড কোনো অভিমানে ক্ষণে ক্ষণে তার গর্জে ওঠে প্রাণ।মাঝেমধ্যে গুলতেকিন ফেসবুকে পুরোনো দিনের কথা তোলেন। অনুসারী আর বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেন তার অনুভূতি।এবারও সামনে এনেছেন এমন এক প্রসঙ্গ৷ হুমায়ূন-ভক্তদের জন্যও এ প্রসঙ্গটি বেশ আগ্রহের।
মেহের আফরোজ শাওনের সঙ্গে যখন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ, তখনই গুলতেকিনকে ছেড়ে উত্তরায় আলাদা বাসায় থাকতে শুরু করেন তিনি। এরপর হঠাৎ একদিন আসে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের ঘোষণা। কে তালাকের নোটিশ পাঠিয়েছিলেন? হুমায়ূন নাকি গুলতেকিন? অনেকেই এখনও ভাবেন গুলতেকিনই। তবে সে তথ্য নিয়ে ভুল ভাঙিয়ে গুলতেকিন আজ তালাকের নোটিশের ছবি দিয়ে লিখেছেন অজানা কথা।
বহু বছর পর মঙ্গলবার গুলতেকিন একটি চিঠির খাম আর সেই তালাকের নোটিশের ছবি দিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এ ধরনের হলদে খামে চিঠি আসলে আমার মেয়ে, শীলা বলত, এগুলো তোমাকে লেখা প্রেমপত্র। শীলার বাবার লেখা আত্মজীবনীমূলক বই পড়ে অনেকেই আমাকে চিঠি লিখত।’
‘জুন মাসের ৬ (২০০৪ সালের) তারিখে স্কুল থেকে ফিরতেই শীলা বলল, তোমার একটা প্রেমপত্র এসেছে। আমি খামটি খুলতে খুলতে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলাম। ওপরে উঠে চিঠিতে চোখ রাখতেই বের হয়ে আসল একটি কাগজ যেখানে লেখা...।’
এই পোস্টের পর আরেকটি পোস্টে গুলতেকিন লিখেছেন, ‘আমি হাসতে হাসতে বললাম, শীলা বাবা, তোমার ড্যাডি তো আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে।’
ডিভোর্স নোটিশে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, ‘বিবাহের পর থেকেই তাহার সহিত আমার কোনোমতেই বনিবনা হইতেছে না। ভবিষ্যতেও বনিবনা হইবার কোনোরূপ সম্ভাবনা না থাকায় আমি অপারগ…’
সর্বশেষ স্ট্যাটাসে গুলতেকিন লেখেন, ‘আমি আমার তিন মেয়ে আর ছেলেকে নিয়ে খুবই চমৎকার জীবন কাটাচ্ছি। শুধু তারা নয়, আমি এখন সাতজনের ‘নানু/নিন্নাই”। আলহামদুলিল্লাহ। আমার নিজের ছোট একটি থাকার জায়গা আছে। আমি তিন বেলা ভালো খাই, ভালো পোশাক পরি। এরপর আর কিছু চাওয়া নেই জীবনের কাছে। দুঃখ দুঃখ ভাব করলে মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন। এসব লিখে দুঃখ বিলাসের সময় এখন নেই। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এদেশের লক্ষ লক্ষ মেয়ে একই ধরনের সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছে। পার্থক্য হচ্ছে, আমি একজন বিখ্যাত মানুষের, এক সময়ের স্ত্রী ছিলাম, তাই আমাদের জীবনযাপন সম্পর্কে মানুষের অনেক কৌতূহল আছে। কিন্তু অন্যদের কথা আমরা জানি না। লক্ষ কোটি নারীরা জীবন সংগ্রাম করছে, শুধুমাত্র আমরা তাদের কথা জানি না।’
১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের তরুণ শিক্ষক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কিশোরী গুলতেকিনের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে আসে এক ছেলে ও তিন মেয়ে। গুলতেকিনের সঙ্গে বিয়েবিচ্ছেদের দুই বছর পর ২০০৫ সালে হুমায়ূন আহমেদ বিয়ে করেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে।
অনেকদিন একা থাকার পর ৫৬ বছর বয়সে কবি আফতাব আহমদের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন গুলতেকিন। শাওনকে বিয়ে করার সময় হুমায়ূন আহমেদের বয়সও ছিল ৫৬। গত বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে মারা যান গুলতেকিনের স্বামী কবি আফতাব আহমদ।
ডিবিসি/আরপিকে