কুয়াশাভেজা মাঠ থেকে সবুজ থেকে সোনালি হয়ে ওঠা সেই পাঁকা ধান কেটে আনার তোড়জোড় চলছে গ্রামে গ্রামে। গৃহস্থ বাড়ির উঠানে এই ধান মাড়াই-মলন শেষে নতুন চালের ভাত আর পিঠা-পুলি-পায়েসে জনপদ থেকে জনপদে হবে নবান্ন।
বৃহস্পতিবার (১৬ নভেম্বর) ছিল অগ্রহায়ণের প্রথম দিবস। কার্তিকের পোয়াতি ধান পেঁকে উঠতে শুরু করেছে এর আগেই। অনেকে এটিকে ‘আঘন’ মাস বলে থাকেন। গ্রামবাংলায় নানি-দাদিরা এ মাসকে আঘন মাস বা ধান কাটার মাস বলেন। পালিত হয় উৎসব। বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে সেই নবান্ন উৎসব।
অগ্রহায়ণের আভিধানিক অর্থ হলো বছরের যে সময় শ্রেষ্ঠ ব্রীহি বা ধান উৎপন্ন হয়। এ মাসে প্রচুর আমন ধান উৎপন্ন হওয়ায় এ মাসেই নবান্ন উৎসব শুরু হয়। ক্ষেত্র বিশেষ কয়েকদিন আগেপিছে ধান কাটা শুরু হলেও মানুষ অগ্রহায়ণ মাসেই নবান্ন উৎসব পালন করে। নবান্ন অর্থ নতুন অন্ন।
এটি কোনো ধর্মীয় আচার, ব্রত কিংবা পূজা নয়; বরং রিচুয়াল বা লোকাচার বলা যেতে পারে। অঞ্চল কিংবা ধর্মভেদে এই লোকাচার পালনের আচার ভিন্ন। আবার তা পালনের সঙ্গে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ অথবা তিথি-নক্ষত্রের যোগ নেই। তবে শস্যপ্রাপ্তির সংযোগ আছে।
আগের দিনে কোনো কোনো অঞ্চলে ফসল কাটার আগে বিজোড় সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে নিয়ে ঘরের চালে বেঁধে রাখা হতো এবং পরে ক্ষেতের বাকি ধান কাটার পর চাল করে নতুন চালের পায়েশ করে নবান্ন করা হতো। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে নবান্নে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় নৃত্য, গান, বাজনাসহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মসূচি পালিত হয়। এছাড়া লাঠিখেলা, বাউলগান, নাগরদোলা, বাঁশি, শখের চুড়ি, খৈ ও মোয়ার পসরা বসে গ্রাম্য মেলায়।
একসময় শস্যকেন্দ্রিক নানা রীতিনীতি প্রচলিত ছিল বাঙালি সমাজে। কারণ ধানই ছিল এদেশে সমৃদ্ধির শেষ কথা। আকাশমণি, কপিলভোগ, কাজলা, কামিনী, কুসুমকলি, ঘৃতশাল, চন্দনচূড়া, চন্দ্রপুলি, চিনিসাগর, জামাইভোগ, নীলকমল, পঙ্খিরাজ, পদ্মরাগ, হীরাশাল, মানিকশোভা, মুক্তাঝুরি- এমন বিচিত্র আর বাহারি নামের রকমরি সব ধানে সমৃদ্ধ এই দেশে কার্তিক মাসের খাদ্যাভাব বাঙালিকে যতটা বিচলিত করত, অগ্রহায়ণের শস্যপ্রাপ্তি তাকে ঠিক ততটাই আনন্দ দিত। আহারে-বিহারে সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার উৎসবই নবান্ন; দেশের প্রাচীনতম লোকউৎসবগুলোর একটি।