একটি নয়, দুটি নয় জেলা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ১৩টি গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে দাবি ভোলার মো. আবুল কাশেম নামের এক ব্যক্তির। নিজেকে তিনি গুগল নিউজের ভোলা প্রতিনিধি হিসেবে দাবিও করেন। পাশাপাশি বিবিসি, এনবিসি, ডেইলি ইরাবতি, আকাশবার্তা টেলিভিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে রাইটার হিসেবে কাজ করছেন বলেও উল্লেখ করেছেন। এছাড়া সরকারি একাধিক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন বলে দাবি মো. আবুল কাশেমের।
এসব প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেন এমন পরিচয় দিয়ে জনে জনে ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। একটি ভিজিটিং কার্ডে নিজেকে কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন মো. আবুল কাশেম।
তবে ডিবিসি নিউজের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবুল কাশেমের ভিজিটিং কার্ডে আন্তর্জাতিক ও সরকারি যেসব মন্ত্রণালয়ের নাম উল্লেখ রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বরং ওইসব প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে তিনি অপকর্ম করে থাকতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

আবুল কাশেমের পৃথক সাতটি ভিজিটিং কার্ডের সন্ধান পেয়েছে ডিবিসি নিউজ। একটি কার্ডে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন গুগল নিউজের ডিস্ট্রিক্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ, ভোলা, বরিশাল, বাংলাদেশ। অপর এক কার্ডে পরিচয় দিয়েছেন ডিস্ট্রিক্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ওমান অবজারভার, মাসকট ডেইলি, টাইমস অব ওমান।
আরেকটি ভিজিটিং কার্ডে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের নাম উল্লেখ করে লিখেছেন গ্রাম বাংলার নিউজ টিভি, জেলা প্রতিনিধি, ভোলা। অন্য একটি ভিজিটিং কার্ডে লেখা রয়েছে, দৈনিক আজকের উত্তরা, সাংবাদিক জেলা প্রতিনিধি, ভোলা, বরিশাল বাংলাদেশ।
অপর এক কার্ডে লেখা রয়েছে, দৈনিক বাংলার দূত এর সাংবাদিক/করসপনডেন্ট কার্ড নং ১৩৮। এ কার্ডে পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি আরও লিখেছেন রাইটার বিবিসি লন্ডন, এনবিসি-ইউএসএ, দ্য ডেইলি ইরাবতি মিয়ানমার, আকাশবার্তা টেলিভিশন কলকাতা, মান্থলি ভারত প্রসঙ্গ-ইন্ডিয়া। যোগাযোগের অফিসের ঠিকানায় তিনি ব্যবহার করেছেন চরফ্যাশন, ভোলা, বাংলাদেশ।
আরেকটি কার্ডে লেখা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা, স্ট্যাফ (সঠিক স্টাফ) রিপোর্টার মাসিক বাংলার দূত। এখানে তিনি দ্য ডেইলি নিউ ইয়র্ক টাইমস রাইটার হিসেবে দাবি করেছেন। ঠিকানা দেওয়া আছে ৬২০, এইট অ্যাভিনিউ, নিউ ইয়র্ক এনওয়াই-১০০১৮, ইউএসএ।

৭ম নম্বর কার্ডে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য তুলে ধরেন। কার্ডটিতে লেখা রয়েছে মো. আবুল কাশেম, কোর্স মেম্বার এফ.এম. (ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট) আইএমসি) ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কমপ্ল্যায়েন্স), এইচআরএম (হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট) পাশাপাশি এ কার্ডে অ্যামবেসেডর স্কিটি, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ উল্লেখ করা হয়। প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাম উল্লেখ করেন বাংলাদেশ বোটানিক্যাল নার্সারি, বাংলাদেশ নীলতিমি ফিশারএইজ, ভোলা নেটিং ফ্যাক্টরি। ঠিকানা হিসেবে লেখা হয় সর্বসাং ২ নং ওয়ার্ড, এওয়াজপুর, চরশশীভূষণ, চরফ্যাশন, ভোলা। কার্ডে একেবারে নিচে লেখা ঋতু ও প্রকৃতি অনুযায়ী উৎপাদনের অর্ডার নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য অফিসার মো. শাহেনুর মিয়া ডিবিসি নিউজকে বলেন, `ভিজিটিং কার্ডে তথ্য অধিদপ্তরের নাম ও লোগো কোনো সাংবাদিক ব্যবহার করতে পারেন না। এটা সম্পূর্ণ অন্যায়। কেবলমাত্র তথ্য অধিদপ্তরে কর্মরত যারা রয়েছেন তারা এটি ব্যবহার করতে পারেন। কেবলমাত্র ডিএফপি মিডিয়াভুক্ত সংবাদ মাধ্যমের সংবাদকর্মীদের পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়া (সরকার অনুমোদিত) এর গণমাধ্যমকর্মীরা এক্রিডেশন কার্ড ব্যবহার করে থাকেন সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য। এটা তথ্য অধিদপ্তর থেকেই দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ ভিজিটিং কার্ডে তথ্য অধিদপ্তরের লোগো ও নাম ব্যবহার করে পরিচয় দিতে পারেন না, এটা অপরাধ।'
অপরদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও তার কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এ শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডিবিসি নিউজকে বলেন, ‘আবুল কাশেম নামে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা কোনো সংস্থায় কেউ অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নেই। উনি যদি এ পরিচয় দেন তাহলে তা মিথ্যা পরিচয় দেওয়া হবে। এরকম যদি কেউ পরিচয় দিয়ে থাকেন তাহলে তা মন্ত্রণালয়ের নজরে আসলে সে অনুযায়ী মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিবে।’
সোমবার (৮ জুলাই) রাত নয়টার দিকে ডিবিসি নিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলে মো. আবুল কাশেম ফোন রিসিভ করেই পরিচয় জেনে নিজের কাজের ব্যস্ততার কথা বলেন। এ সময়ে তাকে গুগল নিউজে কাজ করা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা জানার জন্য যে যথাযথ নিয়মকানুন আছে; এগুলো পালন করেছেন? আপনি জানার জন্য এভাবে ফোন করবেন তা কি হবে?’ এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী অফিসার নওরীন হক ডিবিসি নিউজকে বলেন, ‘আবুল কাশেম নামে কোনো সাংবাদিককে আমি চিনি না। এ উপজেলায় প্রায় ৫০ জন সংবাদকর্মীর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। কিন্তু কখনও আবুল কাশেম নামের কারও সাথে পরিচয় হয়নি।’ একই কথা জানান চরফ্যাশন থানার অফিসার ইনচার্জ মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তবে ট্রুকলারে মো. আবুল কাশেমের মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে মো. জিল্লুর হোসেন নাম দেখা যায়। তাহলে কি আবুল কাশেম নামটিকে ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি? এ বিষয়ে আরও খোঁজ নিচ্ছে ডিবিসি নিউজ। আগামীতে নতুন তথ্য পেলে তা তুলে ধরা হবে।
ডিবিসি/কেএলডি