সোমবারের (২১শে জুলাই) সকালটি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম সাগরের জন্য ছিল স্বপ্ন সত্যি হওয়ার দিন। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর অধ্যায় প্রথম একক উড্ডয়ন বা ‘সলো ফ্লাইট’ এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন বিমানবাহিনীর এই চৌকস অফিসার। কিন্তু দিনের শেষে সেই স্বপ্নই এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে রূপ নিলো। উত্তরায় বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে দাঁড়িয়েছে, আর এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে উন্মোচিত হয়েছে পাইলট তৌকিরের আত্মত্যাগ ও শেষ মুহূর্তের এক অসম সাহসিকতার গল্প।
পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের সর্বশেষ ধাপ হলো ‘সলো ফ্লাইট’। এই ধাপে একজন পাইলট কোনোপ্রকার প্রশিক্ষকের সাহায্য ছাড়াই একা যুদ্ধবিমান পরিচালনা করেন, যা তার সর্বোচ্চ দক্ষতার পরিচায়ক। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির তেমনই একজন কোয়ালিফায়েড পাইলট হিসেবে ঢাকার মতো নগরীর আকাশে এই সংবেদনশীল ফ্লাইট পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কুর্মিটোলা পুরাতন বিমানঘাঁটি থেকে এফ-৭ বিজিআই বিমান নিয়ে উড্ডয়নের পর তিনি উত্তরা, দিয়াবাড়ি, হাতিরঝিলের আকাশজুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিলেন এক বুক আশা নিয়ে।
কন্ট্রোল রুমের সাথে শেষ কথোপকথন
উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির তার বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি আঁচ করতে পারেন। কন্ট্রোল রুমে তিনি জানান, বিমানটি উচ্চতা হারাচ্ছে এবং নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। পরিস্থিতি আঁচ করে কন্ট্রোল রুম থেকে তাকে দ্রুত বিমান থেকে ‘ইজেক্ট’ করার বা জরুরি অবতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করেন তৌকির। তার সামনে তখন ভাসছিল হাজারো সাধারণ মানুষের মুখ।
শেষ মুহূর্তের লড়াই ও আত্মত্যাগ
বিমানবাহিনীর একটি সূত্র জানায়, কন্ট্রোল রুমের নির্দেশনার পরও তৌকির বিমানটি বাঁচানোর এবং জনবহুল এলাকা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেন। বিমানটি তখন এতটাই নিচে চলে এসেছিল এবং নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিল যে, নিরাপদে ‘ইজেক্ট’ করাও প্রায় অসম্ভব ছিল।
তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল বিমানটিকে নিকটবর্তী দিয়াবাড়ির ফাঁকা স্থানে নিয়ে যাওয়া, যাতে ভয়াবহ প্রাণহানি এড়ানো যায়। বেশ কিছুক্ষণ তিনি সেই চেষ্টাও চালিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। নিয়ন্ত্রণহীন বিমানটি দিয়াবাড়ির কাছেই মাটিতে একবার আছড়ে পড়ে (বাউন্স করে) এবং এর চূড়ান্ত গন্তব্য হয় মাইলস্টোন স্কুলের সেই ভবনটি।
তার এই শেষ মুহূর্তের বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টার কারণেই হয়তো আরও বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৭১ জন গুরুতর দগ্ধ ও আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিমানের ঠিক কী কারণে এই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, তা তদন্তের পরেই জানা যাবে।
ডিবিসি/এনএসএফ