ইউক্রেন যুদ্ধে লিপ্ত সেনাদের মনোবল বাড়াতে মধ্যযুগীয় এক বীর রাজপুত্রের তলোয়ার চালানো ডান হাতের হাড়ের টুকরো যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়েছে রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চ। মঙ্গল বাহিনীর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য খ্যাত চতুর্দশ শতাব্দীর গ্র্যান্ড প্রিন্স দিমিত্রি দোন্সকয়ের এই দেহাবশেষকে ফ্রন্টলাইনে রুশ বাহিনীর পাশে 'অদৃশ্য উপস্থিতি' ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে মস্কো।
সম্প্রতি মস্কোর ক্রেমলিন চত্বরে অবস্থিত আর্চেঞ্জেল ক্যাথেড্রালের সংস্কার কাজের সময় দোন্সকয়ের পাথরের কফিনটি (সারকোফ্যাগাস) উন্মোচিত হয়। ১৩৮৯ সালে মারা যাওয়া এই রাজপুত্র রুশ জাতীয়তাবাদীদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তিত্ব। ১৩৮০ সালে ঐতিহাসিক কুলিকোভোর যুদ্ধে তাতার-মঙ্গল গোল্ডেন হোর্ডকে পরাজিত করে তিনি রাশিয়ার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯৮৮ সালে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সাধু’ (সেন্ট) ঘোষণা করে অর্থোডক্স চার্চ। গত আগস্টে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ব্যক্তিগতভাবে এই দেহাবশেষ পরিদর্শন করেন এবং একে রুশ ইতিহাসের ভিত্তি মজবুত করার মতো এক "অনন্য ও চমৎকার আবিষ্কার" বলে অভিহিত করেন।
প্রেসিডেন্ট পুতিনের সামরিক অভিযানকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে আসা রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দোনেৎস্ক অঞ্চলে এই পবিত্র স্মৃতিচিহ্নটি পাঠানো হয়েছে। শক্ত কাচের নিচে নকশাদার একটি ছোট বাক্সে রাখা রাজপুত্রের হাতের হাড়ের এই টুকরোটি ১,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত যুদ্ধরেখা বরাবর বিভিন্ন রুশ ঘাঁটিতে প্রদর্শন করা হবে। বিবৃতিতে চার্চ উল্লেখ করে, ‘যে ডান হাত দিয়ে গ্র্যান্ড প্রিন্স কুলিকোভো প্রান্তরে তলোয়ার চালিয়েছিলেন, সেই হাতেরই একটি টুকরো সেনাদের আত্মিক শক্তি বাড়াতে ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়েছে।’
পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুতিনের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা সের্গেই কিরিয়েঙ্কো, রুশপন্থী স্থানীয় নেতা এবং সামরিক কমান্ডাররা এই স্মৃতিচিহ্নে চুম্বন করেন ও প্রার্থনা করেন। সেখানে মস্কো নিযুক্ত জ্যেষ্ঠ ধর্মগুরু মেট্রোপলিটন ভ্লাদিমির বলেন, সেনাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও এখন স্বর্গীয় শক্তি, ঈশ্বরের সাহায্য এবং সাধুদের আশীর্বাদ প্রয়োজন। যুদ্ধক্ষেত্রের রুশ কমান্ডাররাও দাবি করছেন, এই দেহাবশেষ প্রমাণ করে যে ঈশ্বর রাশিয়ার পক্ষেই আছেন।
তবে দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এবং আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে এমন পদক্ষেপ নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচক ও বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেমলিনকে সন্তুষ্ট করতে ধর্মীয় রীতিনীতির বাইরে গিয়ে এমন প্রচার চালানো হচ্ছে। দোন্সকয়ের সমাধি কয়েক দশক ধরে পরিচিত থাকা সত্ত্বেও তাকে সাধু ঘোষণার প্রায় চার দশক পর কেন হঠাৎ এটি উত্তোলন করে রণাঙ্গনে পাঠানো হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। নির্বাসিত এক অর্থোডক্স ইতিহাসবিদের মতে, যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে সৈন্যদের ঝিমিয়ে পড়া মনোবল চাঙ্গা করতে রাষ্ট্র ও চার্চ এখন ইতিহাসের বীরত্ব ও ধর্মীয় আবেগকে একাকার করে ব্যবহার করছে।
সূত্র: রয়টার্স
ডিবিসি/এমএনকে