কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা ঢলে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক সপ্তাহে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি বেড়েছে প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার।
বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ১২ দশমিক ৮৮ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। সে হিসাবে পানি বিপৎসীমার ৯২ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দৌলতপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পানি বেড়ে যাওয়ায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ও যোগাযোগপথ তলিয়ে গেছে। এতে দুই ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমিতে বন্যার পানি ঢুকে রোপা আমন ধান, কলা ও মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বসতবাড়ির কাছাকাছি পানি পৌঁছে যাওয়ায় গবাদিপশুর নিরাপত্তা, গোখাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সম্ভাব্য সংকট নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন দুর্গত এলাকার মানুষ।
চিলমারী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য শেখ নুরুজ্জামান বলেন, ‘প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে চরম ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং বন্যা দীর্ঘায়িত হলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবার ও গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। বন্যাকবলিত মানুষের কাছে দ্রুত সরকারি ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছানো প্রয়োজন।’
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হঠাৎ পদ্মার পানি বেড়ে ইউনিয়নের সব গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন। সাধারণ মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রেখে উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে।
বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, পানি বাড়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা না করলেও বন্যাকবলিত এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আপাতত ক্লাসে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে এবং শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা থাকবে, যাতে বন্যায় গৃহহীন হয়ে পড়া মানুষ সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সতর্ক রয়েছে এবং দুর্গত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পানিবন্দী মানুষের সহায়তা ও নিরাপত্তার স্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ইউএনও জানান, ইতোমধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
ডিবিসি/এমএনকে