আফগানিস্তান থেকে ইরাক:

মার্কিন সেনাদের হাতে ২৫ বছরে প্রাণ গেছে অন্তত ৪৫ লাখ মানুষের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

১ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হওয়া একের পর এক সামরিক অভিযানের ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়া ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ নামে পরিচালিত এসব অভিযানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ৪৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার ১৯ সদস্য চারটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ছিনতাই করে নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে হামলা চালায়। ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন। এর এক মাসেরও কম সময় পর আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় কথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’।


ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪৫ থেকে ৪৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ। আর রোগ, অপুষ্টি ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত জটিলতায় পরোক্ষভাবে মারা গেছেন ৩৬ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ।


আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধ:
২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালেবান সরকারের পতন ঘটলেও যুদ্ধ থামেনি। চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের শাসনামলজুড়ে প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে পরিণত হয়।


কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানে সরাসরি যুদ্ধের কারণে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি ক্ষুধা, রোগ ও চিকিৎসার অভাবে আরও কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যুদ্ধের আগে দেশটির ৬২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগলেও যুদ্ধের পর এ হার বেড়ে ৯২ শতাংশে পৌঁছায়।


২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আবারও ক্ষমতায় ফেরে তালেবান। তবে দীর্ঘ যুদ্ধের ক্ষত এখনো দেশটিকে তাড়া করছে। অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ও স্থলমাইন এখনো বেসামরিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।


ইরাকে হামলা, হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম:
২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে-এমন অভিযোগ সামনে রেখে শুরু হওয়া ওই যুদ্ধের পর দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতায় পড়ে ইরাক।


যুদ্ধ শুরুর সময় ওমর নামের এক ইরাকি তরুণের বয়স ছিল ১৮ বছর। বোমা হামলার শব্দ ও আতঙ্কে ভরা সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, যুদ্ধের মধ্যে কয়েকজন বন্ধু পরিস্থিতি দেখতে বাইরে গিয়েছিলেন। তিনি তাদের যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তারা আর ফিরে আসেননি।


কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ইরাক যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


আকাশপথের যুদ্ধে বাড়তে থাকে বেসামরিক মৃত্যু:
স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাক-সিরিয়ায় ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের পর পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪২৩টি হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ২ হাজার ৪৯৯ থেকে ৪ হাজার ১ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ৪২৪ থেকে ৯৬৬ জন।


ইয়েমেনে অন্তত ১৮৬টি হামলা ও অভিযানে কমপক্ষে ৮৫৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ১৫৮ জন বেসামরিক মানুষ। সোমালিয়ায় ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৯ থেকে ২৩টি হামলায় ১৮৮ থেকে ২৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।


২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চলাকালে বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নেতৃত্বে বিমান অভিযান পরিচালনা করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, সাত মাসে লিবিয়ায় প্রায় ৯ হাজার ৭০০টি হামলা চালানো হয়েছিল।


২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসবিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানেও ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত মার্কিন কর্মকর্তারা ১ হাজার ৪১৭ বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে এয়ারওয়ার্সের হিসাবে, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৪ থেকে ১৩ হাজার ৩৬০ পর্যন্ত হতে পারে।


ঘরছাড়া ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ:
এসব যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতিগুলোর একটি হলো ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি। কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় ২০০১ সালের পরের যুদ্ধগুলোর কারণে ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছাড়তে কিংবা নিজ দেশের ভেতরেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।


যুদ্ধ শেষ হলেও তাদের অনেকেই এখনো নিজ ঘরে ফিরতে পারেননি। গত বছর ইরান ও পাকিস্তান থেকে প্রায় ২৯ লাখ আফগানকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের দুই দশক পার হওয়ার পরও ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন।
৪০ বছর বয়সী আফগান নারী আয়েশার জীবনও দীর্ঘ বাস্তুচ্যুতির এক উদাহরণ। ১৯৯৪ সালে প্রথমবার আফগানিস্তান ছেড়েছিলেন তিনি। ২০০০ সালে দেশে ফিরে এলেও ২০০২ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর আবারও পালাতে হয় তাকে। এরপর ১১ বছর ইরানে থাকার পর সন্তানদের নিয়ে ফের আফগানিস্তানে ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি।


যুদ্ধের ক্ষত মার্কিন সেনাদের মধ্যেও:
যুদ্ধের মূল্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বেসামরিক মানুষকেই দিতে হয়নি। আফগানিস্তানে ৮ লাখের বেশি মার্কিন সেনা দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে শেষ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ২০ হাজার সেনা আহত হন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য মিত্র দেশের সামরিক সদস্য মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ এবং আহতের সংখ্যা ২৩ হাজার ৫০০-এর বেশি।


ইরাক যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের মধ্যে ৩ হাজার ৪৮১ জন নিহত এবং ৩১ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।


তবে এসব যুদ্ধের ক্ষতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালের পরের যুদ্ধগুলোতে অংশ নেওয়া মার্কিন সাবেক সেনাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা দিতে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাত ও আত্মহত্যার ঘটনাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।


৮ ট্রিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ:
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এসব যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ও পৌঁছেছে বিপুল অঙ্কে। কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, যুদ্ধ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। সাবেক সেনাদের ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবার জন্য আরও ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের হিসাব যুক্ত করলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় অন্তত ৮ ট্রিলিয়ন ডলার।


অর্থাৎ ৯/১১ হামলার পর শুরু হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুধু লাখ লাখ মানুষের প্রাণই কেড়ে নেয়নি; কোটি মানুষকে ঘরছাড়া করেছে, একটি প্রজন্মের জীবন বদলে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি বোঝা তৈরি করেছে।


২৫ বছর পরও এসব যুদ্ধের পূর্ণ হিসাব শেষ হয়নি। আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বোমা ও যুদ্ধের দৃশ্যমান ক্ষত হয়তো সময়ের সঙ্গে মুছে যাচ্ছে। কিন্তু নিহতদের পরিবার, বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন এবং যুদ্ধফেরত সেনাদের মানসিক ক্ষত এখনো মনে করিয়ে দেয়-যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঘোষণা এলেই তার মানবিক মূল্য শেষ হয়ে যায় না।


সূত্র: আল জাজিরা


ডিবিসি/এসএফএল

আরও পড়ুন