ধুলোবালি মাখা চটের বস্তা আর সাধারণ দড়ির চেনা গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের সোনালী আঁশ। আধুনিক রুচি, উদ্ভাবনী নকশা এবং প্রযুক্তির নিখুঁত সমন্বয়ে পাট এখন আর নিছক কৃষিজ পণ্য নয়; এটি পরিণত হয়েছে এক উচ্চমানের বৈশ্বিক ‘ফ্যাশন স্টেটমেন্ট’-এ।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রায় ২৮২টি পণ্যকে বহুমুখী পাটজাত পণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড ও শপিং মলগুলোতে নতুন ট্রেন্ড তৈরি করছে।
ঢাকার অদূরে হস্তশিল্প কারখানায় কর্মরত কারিগরদের হাত ধরে সাধারণ তোষা পাট রূপান্তরিত হচ্ছে বিশ্বমানের ফ্যাশন সামগ্রীতে। এর মধ্যে আধুনিক ডিজাইনের লেডিস হ্যান্ডব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ, সুদৃশ্য জুতো, কর্পোরেট অফিস ফাইল ও জ্যাকেট আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নজর কাড়ছে।
ফ্যাশনের পাশাপাশি গৃহসজ্জা বা হোম ডেকোরেও জায়গা করে নিয়েছে পাট নান্দনিক ওয়ালম্যাট, ডাইনিং টেবিল রানার, বিলাসবহুল কার্পেট, জানলার পর্দা ও বাহারি কুশন কভার এখন বিদেশি ড্রয়িংরুমের শোভা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বিশ্বখ্যাত ‘সোনালী ব্যাগ’ এবং পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং সামগ্রী বৈশ্বিক বাজারে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে।
শুধু আঁশেই নয়, মূল্য সংযোজনের এই ধারা ছড়িয়ে পড়েছে পাটের পরিত্যক্ত অংশ পাটকাঠিতেও। বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাটকাঠি পুড়িয়ে তৈরি অ্যাক্টিভেটেড চারকোল বা কার্বন পাউডার আন্তর্জাতিক বাজারে এক মূল্যবান কাঁচামাল হয়ে উঠেছে। ব্যাটারি, কসমেটিকস, কার্বন পেপার এবং বিভিন্ন প্রসাধনসামগ্রী তৈরির কাঁচামাল হিসেবে এই চারকোল এখন চীনসহ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণে রপ্তানি হচ্ছে, যা পাট খাতকে বহুমুখী আয়ের উৎসে পরিণত করেছে।
বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক বর্জনের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ বা পরিবেশ আন্দোলনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে টানা চার বছরের মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের পাট খাত।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের বৈশ্বিক রপ্তানি আয় পৌঁছেছে ৮৮৩.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭.৮ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৩৮টি দেশে বাংলাদেশের ২৮২ ধরনের বহুমুখী পাটপণ্য পৌঁছে যাচ্ছে।
এই বৈশ্বিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে সরকার ‘বাংলাদেশ পাট খাত উন্নয়ন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-২০৩১)’ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এর লক্ষ্য আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে পাট খাতের বার্ষিক রপ্তানি আয় ১.৬৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং উচ্চমূল্যের বহুমুখী পাটপণ্যের অংশ মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এনে উৎপাদন সচল করা, ঢাকা ও খুলনার প্রধান টেস্টিং ল্যাব আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে পাটপণ্য প্রদর্শন কেন্দ্র চালুর মতো উদ্যোগ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংকে আরও শক্তিশালী করছে।
একসময় অবহেলিত ঐতিহ্যবাহী পাট আজ তার খোলস বদলে বিশ্বমঞ্চে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব লাইফস্টাইলের প্রতীক। কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় সোনালী আঁশের এই বৈশ্বিক রূপান্তর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি করেছে নতুন এক দিগন্ত।
ডিবিসি/এমএনকে