‘যাওয়ার কোনো জায়গা নেই’ বাস্তবতার এই নিষ্ঠুর সত্য মেনে নিয়েই মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বাধ্য হয়ে গাজায় বসবাস করছেন অসংখ্য ফিলিস্তিনি। নিরাপদ আশ্রয়ের এই চরম সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে মাথা গোঁজার যে ভয়াবহ পরিণতি, তা আরও একবার দেখল বিশ্ব। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ভোরে পশ্চিম গাজা শহরের যুদ্ধবিধ্বস্ত ‘আল-সাদা’ নামের একটি আবাসিক ভবন হঠাৎ ধসে অন্তত ২১ জন ফিলিস্তিনির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যা গাজার বর্তমান মানবিক সংকটের এক নিদারুণ চিত্র তুলে ধরেছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন ৩৭ বছর বয়সী হায়াত আল-আজলাহ। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাঁকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, চোখের পলকে তিনি হারিয়েছেন তাঁর বাবা-মা, চার ভাইবোন এবং তিন ভাগ্নে-ভাগ্নিসহ পরিবারের নয়জন সদস্যকে। তাঁবুর অমানবিক ও কঠিন জীবন থেকে একটু স্বস্তি পেতে প্রায় দুই মাস আগে তাঁরা এই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের তৃতীয় তলার একটি খালি ফ্ল্যাটে উঠেছিলেন। হায়াতের চার সন্তান অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ে ডালিয়া মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আগামী সপ্তাহেই এই পরিবারে একটি বিয়ের আনন্দোৎসব হওয়ার কথা ছিল, যা এখন বিষাদে রূপ নিয়েছে।
অন্যদিকে, আল-শিফা হাসপাতালে নিহতদের স্বজনদের গগনবিদারী আহাজারি চারপাশের পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে। সত্তরোর্ধ্ব উম্ম মাহমুদ সা'দা তাঁর ছেলে মাহমুদ, পুত্রবধূ এবং তাঁদের সাত সন্তানের মৃত্যুতে শোকে একেবারে ভেঙে পড়েছেন। দক্ষিণ গাজায় বাস্তুচ্যুত থাকার পর তাঁবুর অমানবিক জীবন ও চরম আর্থিক সংকটে দিশেহারা হয়ে মাহমুদও বাধ্য হয়ে এই ভবনে সাময়িক আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান তাঁর মা।
উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগও চরম সংকটের মুখে পড়েছে। গাজায় আমদানি ও পুনর্গঠনের ওপর ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারী যন্ত্রপাতি এবং অত্যাবশ্যকীয় সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে উদ্ধারকারী দলগুলোকে শুধুমাত্র সাধারণ যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ কংক্রিট ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিচে চাপা পড়া মানুষদের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভবনটি ধসে পড়ার এই ঘটনা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। যুদ্ধের শুরু থেকেই ভবনটি দৃশ্যত ক্ষতিগ্রস্ত ছিল এবং প্রায় প্রতিদিনই এর দেওয়ালের অংশ বা পাথর খসে পড়ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী মনসুর বাকরুন এবং হুযাইফা মোহাম্মদ জানান, স্থানীয়রা এই ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই করছিলেন। তা সত্ত্বেও, অন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয় বা যাওয়ার মতো কোনো বিকল্প জায়গা না থাকায়, নিরুপায় মানুষগুলো নিশ্চিত জীবনের ঝুঁকি জেনেও সেখানেই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছিলেন।
সূত্র: আলজাজিরা
ডিবিসি/পিআরএএন