ক্রমাগত লোকসান ও চিনিকলের কাঁচামাল সংকটের কারণে যখন অনেক কৃষক আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দেশে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে ‘ফিলিপাইনস ব্ল্যাক সুগারকেইন’ বা কালো আখ। সাধারণ মানুষের কাছে ‘ব্ল্যাক রুবি’ নামে পরিচিত এই জাতটিকে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিএসআরআই আখ ৪৯’ নামে রিলিজ করেছে।
সম্প্রতি গাজীপুরে বেসরকারি উদ্যোগে এই আখের পরীক্ষামূলক চাষে মিলেছে ব্যাপক সাফল্য।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলায় বর্তমানে ১,৬০৩ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আখ চাষ হচ্ছে। প্রচলিত এসব জাতের ভিড়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ব্যতিক্রমী রঙের বিএসআরআই আখ ৪৯। কৃষির বৈচিত্র্যায়ন ও গবেষণার অংশ হিসেবে বসুন্ধরা এগ্রো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (বেসিল) গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ কালিয়াকৈর উপজেলার সাকাশ্বর এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এই আখের চাষ শুরু করে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।
প্রকল্পের মাঠ গবেষণার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানান, প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে চারার দূরত্ব কমিয়ে রোপণ করায় বিঘাপ্রতি প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ চারা লাগানো সম্ভব হয়েছে, যা সাধারণের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। রোপণের ১২ মাসের মধ্যেই গাছগুলো ১৩ থেকে ১৫ ফুট লম্বা হচ্ছে। দোআঁশ মাটিতে রোপিত এই আখের জমিতে সাথী ফসল হিসেবে শাকসবজিও চাষ করা যায়। এই জাতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ‘মুড়ি আখ’ বা ‘রেটুন’ ফলনের ক্ষমতা। একবার রোপণ করলে প্রথম বছর ফসল কাটার পর গোড়া থেকে পুনরায় চারা গজায়, যা থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে নতুন করে জমি তৈরি বা চারার খরচ ছাড়াই ফলন পাওয়া যায়।
বিএসআরআই, গাজীপুর আঞ্চলিক অফিসের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নিলুফার ইসলাম জানান, চিবিয়ে খাওয়া বা জুস তৈরির জন্য এটি একটি অতুলনীয় জাত। এর বহিরাবরণ নরম, গিট কোমল এবং একক আখ থেকে ১.৫ থেকে ১.৮ লিটার পর্যন্ত পুষ্টিকর রস পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই আখের রসে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাত্র ৪০, যা ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায় না। এছাড়া এতে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ফ্ল্যাভোনয়েড এবং ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, জিংক ও আয়রনের মতো খনিজ উপাদান রয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের হিসেব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে প্রথম বছরে ৬০-৭০ হাজার টাকা খরচের বিপরীতে ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত নিট মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে খরচ কমে যাওয়ায় নিট লাভের পরিমাণ বেড়ে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে। বেসিল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ৪০০ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এই আখ চাষ এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে জুস ও গুড় বিদেশে রপ্তানির বৃহৎ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারাও কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দিতে সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি-বেসরকারি সঠিক সমন্বয় ও বাণিজ্যিক বাজারজাতকরণের অবকাঠামো তৈরি করা গেলে এই ব্ল্যাক সুগারকেইন গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হবে।
ডিবিসি/এমএনকে