সাম্য, প্রেম ও প্রকৃতির কবি আশামণি। প্রায় চার দশক ধরে সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি নড়াইলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি। স্কুলশিক্ষক বাবার নামে পাঠাগার গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘আশা মনি চর্চিকা’ নামের একটি ব্যতিক্রমী কেন্দ্র। সাহিত্য ও সমাজকর্মে বিশেষ অবদানের জন্য দেশ-বিদেশের নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এই গুণী কবি।
নড়াইলের শান্ত-স্বচ্ছ চিত্রা নদীর পাড়ে, সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা আশামণি। ১৯৭২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষের সাহিত্য প্রতিভার উন্মেষ ঘটে শৈশবেই। ১৪ বছর বয়সে শুরু করেন লেখালেখি। ১৯৮৫ সালে সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত ‘সন্ধান’ পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা ‘আমার সান্নিধ্যে এসো না’ প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি লিখেছেন ২০টি বই, যার মধ্যে ৯টিই কবিতার। তার দুটি কবিতার বই এরই মধ্যে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। প্রতি বছর অমর একুশে বইমেলা ছাড়াও নিউইয়র্ক বইমেলায় তার বই স্থান পায়।
নিজের সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজে শিক্ষার আলো ছড়াতেও সমানভাবে কাজ করছেন তিনি। তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে মানুষকে বইমুখী করতে ২০০৬ সালে স্কুলশিক্ষক প্রয়াত বাবা আব্দুস সালামের নামে তিনি গড়ে তোলেন একটি পাঠাগার। প্রায় চার হাজার বইয়ের এই সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে হারিয়ে যেতে বসা কাঁসা-পিতল, মাটি ও কাঠের নান্দনিক জিনিসপত্রসহ বরেণ্য ব্যক্তিদের দুর্লভ ছবি।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ২০১৯ সালে নড়াইল পৌর এলাকা সংলগ্ন ননীক্ষীরে প্রায় ৮ শতক জমির ওপর তিনি গড়ে তোলেন শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ‘আশা মনি চর্চিকা’। এখানে শিশুদের বিনামূল্যে পড়ালেখা, গান ও আবৃত্তি শেখানো হয়। এমন সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোররাও। জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী, কবি, সাহিত্যিক থেকে শুরু করে সৃজনশীল ব্যক্তিরা প্রায়ই ছুটে আসেন ‘আশা মনি চর্চিকা’ কেন্দ্রে। তার এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন নড়াইল জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আছাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, গবেষক ও কবি হরিদাস ঠাকুর।
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আশামণি দেশে-বিদেশে মোট ২৫টি সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে দেশের ভেতরে ১৮টি এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ‘সংলাপ সাহিত্য পদক’, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মাননাসহ ৭টি পুরস্কার অন্যতম। পারিবারিক জীবনে ১৯৯১ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া আশামণি এক সন্তানের জননী। তার একমাত্র সন্তান বর্তমানে ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদী সংগীত (পাখোয়াজ) নিয়ে উচ্চতর অধ্যয়নরত। সম্প্রতি কবি আশামণির ৫২তম জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে সম্মাননা স্মারকগ্রন্থ ‘স্বননে মননে আশামণি’।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সাম্যের কবি আশামণি বলেন, ‘পাঠকসহ গুণীজনের ভালোবাসায় এগিয়ে যেতে চাই। আজীবন শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চাই।’ আমৃত্যু সাহিত্য সাধনার মধ্য দিয়ে মানবজীবন ও সমাজ বাস্তবতার নানান সঙ্গতি-অসঙ্গতি লেখনীতে তুলে ধরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
ডিবিসি/এমএনকে