যশোরের চৌগাছায় পুলিশের ওপর হামলার আলোচিত একটি মামলার চূড়ান্ত চার্জশিট নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। মামলার এজাহারে নাম থাকা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দুই আসামির নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন অনেক ব্যক্তিকে চার্জশিটভুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। এ নিয়ে পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
গত বছরের ৬ মে যশোরের চৌগাছা উপজেলার সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের মাকাপুর গ্রামে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি সিয়াম হাসানকে আটক করতে যান চৌগাছা থানার উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান মারুফ, উত্তম কুমার মণ্ডলসহ পুলিশের একটি দল। পুলিশ সিয়ামকে আটক করে ফেরার পথে তার সহযোগীরা হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
খবর পেয়ে তৎকালীন চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন, উপপরিদর্শক লাভলুসহ আরও পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ওসি আনোয়ার হোসেন, উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান মারুফ, লাভলু, উত্তম কুমারসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন।
ঘটনার পরদিন ৭ মে উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান মারুফ বাদী হয়ে চৌগাছা থানায় মামলা করেন। মামলায় সিয়াম হাসান, আনিসুর রহমান ও জেসমিন আক্তার লাকিসহ ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ৩০ জুলাই মামলাটির চার্জশিট দেওয়া হয়। তবে এতে এজাহারের ৪ নম্বর আসামি আনিসুর রহমান এবং ৩৬ নম্বর আসামি জেসমিন আক্তার লাকির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়েই মূলত স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনার সময় তোলা ছবিতে নীল-সাদা চেক গেঞ্জি পরিহিত আনিসুর রহমানকে হাতে স্টিলের টর্চলাইট নিয়ে ঘটনাস্থলে দেখা যায়। তাদের দাবি, ওই টর্চলাইট ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করা হয়েছিল। মামলার বাদী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তৎকালীন উপপরিদর্শক মেহেদী হাসান মারুফও দাবি করেছেন, তিনি আনিসুরকে টর্চলাইট হাতে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করতে দেখেছেন।
অন্যদিকে চার্জশিটভুক্ত কয়েকজন গ্রামবাসীর দাবি, তারা ঘটনার সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন না এবং ঘটনার বিষয়ে অবগতও ছিলেন না। অথচ তাদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, দিনের বেলায় এলাকায় কাজকর্ম করলেও আটকের আশঙ্কায় রাতে অনেককে বাড়ির বাইরে থাকতে হচ্ছে।
চার্জশিটভুক্ত ওই ব্যক্তিরা মামলাটি পুনঃতদন্ত করে প্রকৃত হামলাকারীদের অন্তর্ভুক্ত এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, তদন্তে প্রকৃত ঘটনা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
তবে চার্জশিট থেকে অব্যাহতি পাওয়া আনিসুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না; কিছুটা দূরে একটি চায়ের দোকানে অবস্থান করছিলেন। জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষ পুলিশকে প্রভাবিত করে তার নাম মামলার এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করেছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
মামলার বাদী মেহেদী হাসান মারুফ অবশ্য ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তার দাবি, ঘটনার সময় আনিসুর রহমানকে হাতে থাকা স্টিলের টর্চলাইট দিয়ে তৎকালীন ওসিসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা করতে তিনি দেখেছেন।
এ বিষয়ে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক সার্কেল) মো. আহসান হাবীবের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে সম্পূরক চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করার আইনগত সুযোগ রয়েছে।
তবে এজাহারে নাম থাকা এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও ছবি থাকার দাবি সত্ত্বেও দুই ব্যক্তির নাম কী কারণে চূড়ান্ত চার্জশিট থেকে বাদ পড়েছে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তার ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
চার্জশিটভুক্ত কয়েকজন গ্রামবাসীর ভাষ্য, পুলিশের ওপর হামলার মতো গুরুতর মামলায় প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করার পাশাপাশি নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের দাবি, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পুনঃতদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হোক।
ডিবিসি/এমএনকে