সারা বাংলা

এক পায়ে গাছে উঠে সংসার চালান রংপুরের ‘ট্রি ম্যান’ একরামুল

রংপুর প্রতিনিধি

ডিবিসি নিউজ

৩ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

একটি পা পঙ্গু। হাঁটাচলাও করতে হয় কষ্ট করে। তবু থেমে নেই জীবনসংগ্রাম। এক পায়ে ভর করে লাফিয়ে লাফিয়ে গাছে ওঠেন, কাটেন ডালপালা, পরিষ্কার করেন সুপারি ও বিভিন্ন গাছ। এই কাজ করেই চলে তাঁর সংসার। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার দক্ষিণ মদামোদন এলাকার একরামুলকে স্থানীয়দের অনেকেই চেনেন ‘বৃক্ষমানব’ বা ‘ট্রি ম্যান’ নামে।

একরামুল স্থানীয় আব্দুল করিমের ছেলে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের ছয় সদস্যের ভরণপোষণের বড় দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।

 

পরিবারের সদস্যরা জানান, চার বছর বয়সে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন একরামুল। এরপর তাঁর একটি পা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পাটি প্রায় অকেজো হয়ে যায়।

 

শৈশবে সহপাঠী ও প্রতিবেশীদের সুপারি গাছসহ বিভিন্ন গাছে উঠতে দেখে একরামুলেরও প্রবল ইচ্ছা জাগত গাছে ওঠার। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতায় শুরুতে তা সম্ভব হতো না। সেই আক্ষেপ থেকেই একসময় শুরু করেন চেষ্টা। দীর্ঘ অনুশীলনের পর এক পায়ে ভর করে গাছে ওঠার কৌশল আয়ত্ত করেন তিনি। এখন সেই দক্ষতাই তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন।

 

প্রতিদিন সকাল হলে একটি কাঠের স্ট্রেচার ও দা নিয়ে কাজের খোঁজে বের হন একরামুল। এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে মানুষের বাড়ি কিংবা বাগানে পৌঁছান। এরপর ঝুঁকি নিয়ে গাছের মগডালে উঠে শুকনো ডাল কাটা, সুপারি গাছ পরিষ্কারসহ বিভিন্ন কাজ করেন।

 

একরামুল জানান, একটি গাছ পরিষ্কার করে সাধারণত ১০ থেকে ২০ টাকা পান। সারাদিন কাজ করে কখনো চার থেকে পাঁচশ টাকা আয় হয়। সেই টাকাতেই চলে পরিবারের দৈনন্দিন খরচ।

 

অভাবের কারণে তাঁর বড় দুই ভাইও বাবা-মাকে নিয়মিত সহযোগিতা করতে পারেন না। ফলে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায়িত্বও মূলত একরামুলকেই নিতে হয়েছে।

 

ঝড়-বৃষ্টি কিংবা শারীরিক কষ্ট কোনোটিই তাঁকে কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে না। কারণ একদিন কাজে বের হতে না পারলে পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

 

তবে একরামুলের এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিয়ে প্রতিনিয়ত উৎকণ্ঠায় থাকেন পরিবারের সদস্যরা। বাবা-মায়ের ভয়, যেকোনো সময় গাছ থেকে পড়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। স্বামীর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তাঁর স্ত্রী। ভাইয়ের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে চোখে পানি আসে বোনেরও।

 

স্থানীয় বাসিন্দারাও একরামুলের জন্য একটি নিরাপদ ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা চান। তাঁদের মতে, সরকার, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা সমাজের বিত্তবান কেউ এগিয়ে এসে তাঁকে একটি ছোট দোকান বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবস্থা করে দিলে ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশা থেকে সরে আসতে পারবেন তিনি।

 

একরামুলের একমাত্র কর্মসম্বল একটি দা। সেটি হাতে নিয়েই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাছে ওঠেন তিনি। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কাজ চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

 

একরামুল বলেন, তিনি কারও করুণা চান না; চান কাজ করে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার একটি স্থায়ী সুযোগ। একটি ছোট দোকান কিংবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পেলে বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে নিরাপদে জীবন চালাতে পারবেন বলে আশা তাঁর।

 

স্থানীয়দেরও একই আবেদন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কেউ যদি একরামুলের জন্য একটি স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি করে দেন, তাহলে প্রতিদিন এক পায়ে ভর করে গাছের মগডালে উঠে আর জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে হবে না রংপুরের এই ‘ট্রি ম্যান’কে।

 

ডিবিসি/এমএনকে

আরও পড়ুন