নিজ পরিবারের সদস্য দ্বারাই ধর্ষণ হচ্ছেন অনেকে।
সাম্প্রতিক সময়ে জামালপুরে আশংঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে গেছে ধর্ষণের ঘটনা। বিশেষ করে নিজ পরিবারের সদস্য দ্বারা কন্যা শিশু ধর্ষণের ঘটনা ভাবিয়ে তুলছে সচেতন অভিভাবকদের। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির নেত্রীদের দাবি বিচারহীনতাই ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার মূল কারন। আর পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন ধর্ষণের মাত্রা কিছুটা বাড়লেও, পুলিশী তৎপরতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারনে বর্তমানে তা কমে এসেছে।
চলতি বছরের ৭ জুন জেলার ইসলামপুর উপজেলায় যমুনার দূর্গম চর মুন্নিয়ায় ধর্ষণের শিকার হয় ১৪ বছরের এক কিশোরী। ওই কিশোরীর ধর্ষক আর কেউ নয় তারই জন্মদাতা পিতা। মেয়েকে ছাগল রেখে আসার কথা বলে পাট ক্ষেতে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে ওই লম্পট। পরে ধর্ষিতার চিৎকারে লোকজন এগিয়ে এসে জামির উদ্দিনকে আটক করে পুলিশ দেয়।
ঘটনার পরদিন ধর্ষিতার মা বাদী হয়ে ইসলামপুর থানায় স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। এই ঘটনার কিছুদিন পর মুন্নিয়া আদর্শ গ্রাম আশ্রয়ণ কেন্দ্রের বাসিন্দারা ধর্ষিতা ওই কিশোরী ও তার মাকে নষ্টা পরিবার আঙ্খা দিয়ে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দেয়। পরে অসহায় ওই পরিবারটি পার্শ্ববর্তী কুড়িগ্রাম জেলার ফুলছুড়ি উপজেলায় গিয়ে আশ্রয় নেয়।
এদিকে একই উপজেলার পলবান্ধা ইউনিয়নের পূর্ববাহাদুরপুর গ্রামে চাচার ধর্ষণের শিকার হয়ে চলতি বছরের মে মাসে কন্যা সন্তানের জন্ম দেয় ১৬ বছরের এক কিশোরী। ধর্ষণ মামলায় লম্পট চাচা কারাগারে থাকলেও পাঁচ মাস বয়সী মেয়ের পিতৃ পরিচয়ের দাবিতে আইনের কাঠগড়া আর স্থানীয় মাতাব্বরদের দারে দারে ঘুরছে ধর্ষণের শিকার ওই কিশোরীর মা। আর অজানা ভবিষ্যত নিয়েই ধর্ষিতা কিশোরী মায়ের কোলে বেড়ে উঠছে ৫ মাস বয়সী শিশু কন্যা।
চলতি বছরের ২৬ জুন বকশীগঞ্জ উপজেলার বগারচর ইউনিয়নের খাসীরপাড়া গ্রামে তৃতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রীকে রাতের আধাঁরে বাড়ির উঠান থেকে তুলে নিয়ে যায় আপন ও শাকিল নামে দুই কিশোর। পরে বাড়ির পাশে জঙ্গলে নিয়ে ওই ছাত্রীর হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করে শাকিল, আর ধর্ষণের সময় পাহাড়া দেয় অপর কিশোর আপন। এ সময় ওই ছাত্রীর চিৎকারে লোকজন এগিয়ে এলে শাকিল ও আপন পালিয়ে যায় এবং রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্বজনরা।
ধর্ষণের শিকার ওই স্কুল ছাত্রী ও তার মায়ের অভিযোগ, ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও মাতাব্বরা বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করছে এবং হুমকি দিচ্ছে। তাদের দাবি ধর্ষকের শাস্তি স্থানীয় শালিসের মাধ্যমে নয়, প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। যাতে করে ভবিষ্যতে আর কেউ ধর্ষণ করতে সাহস না পায়।
এছাড়াও একই উপজেলায় পৌরসভার শিমারপাড়া এলাকায় স্বামী বাড়িতে না থাকার সুযোগে ২৭ জুন রাতের আধাঁরে ঘরে ঢুকে দুই সন্তানের গলায় ছুরি ধরে মাকে ধর্ষণ করে প্রতিবেশী যুবক জামাল মিয়া। পরে ধর্ষিতার অভিযোগের প্রেক্ষিতে র্যাব অভিযান চালিয়ে ধর্ষক জামাল মিয়াকে আটক করে।
২০১৮ সালের জুলাই মাস থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত জামালপুর জেলায় নারী ও শিশুসহ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৬ জন, আর ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে ১৯টি। এছাড়াও চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৫টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন অভিভাবক সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বহিরাগত লম্পটদের কাছ থেকে মেয়েদের দেখেশুনে রাখা হয়তো সম্ভব কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই যদি ধর্ষক লুকিয়ে থাকে তাহলে মেয়েদের কিভাবে রক্ষা করা সম্ভব হবে। বাইরের মানুষের দ্বারা ধর্ষণের ঘটনার চাইতে নিজ পরিবারের সদস্যর কাছে ধর্ষণের শিকার হওয়া অত্যন্ত বেদনা-দায়ক। তাই মেয়েদের সম্ভ্রম রক্ষায় তাদেরকে সবসময় দুষচিন্তায় থাকতে হয়।
জামালপুর জজ আদালতের আইনজীবী শামীম আরা জানান, ধর্ষণ মামলায় দীর্ঘসূত্রিকার কারনে বাদী আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে এ সংক্রান্ত মামলায় স্বাক্ষী, মেডিকেল টিমের সদস্য, মামলার আইও বেশিরভাগ সময় অনুপস্থিত থাকে এবং ভিকটিমকেও বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত ধর্ষণ মামলাগুলোর আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়না। এছাড়াও এক জরিপ অনুযায়ী ধর্ষণ ও নির্যাতনের ৬৫% ঘটনাই ঘটে পরিবারের মধ্য থেকে, তাই বেশিরভাগ সময় মামলাই হয়না।
আমরাই পারি, পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জামালপুর জেলা জোটের আহ্বায়ক শামীমা খান জানান, সারাদেশের মতো জামালপুরে যেসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, এসব ধর্ষণের কোন বিচার হয়েছে বলে আমরা শুনতে পাইনা। মূলত বিচারহীনতাই এই ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার কারন। আর উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে মেয়েরা এখন নিজ পরিবারের সদস্য দ্বারাই ধর্ষণ আর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ কিছুটা বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে জামালপুরের পুলিশ সুপার মো: দেলোয়ার হোসেন বলেন, ধর্ষণ বৃদ্ধির ঘটনায় পুলিশী তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে ইভটিজিং রোধে পুলিশী টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, মসজিদের ইমাম, সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে জনসচেতনতা বিষয়ক ক্যাম্পেইন করা হচ্ছে। ফলে বর্তমানে জামালপুর জেলায় ধর্ষণের সংখ্যা কমে এসেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলায় ধর্ষণ হয়েছে ২০টি এবং ধর্ষণ চেষ্টা হয়েছে ৮টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জেলায় ধর্ষণ হয়েছে ২৬টি এবং ধর্ষণ চেষ্টা হয়েছে ১১টি। যা গত ৬ মাসের চেয়ে বেশি।