• বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯
  • সকাল ৮:১৪

বুলবুলে ডিম পাহাড়ে

বুলবুলে ডিম পাহাড়ে
মনের প্রবল ইচ্ছা,  প্রতিকূলতার মধ্যেও কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে ‘দুই চাকার মেশিন বন্ধু’ নিয়ে মাইলের পর মাইল যাওয়া, কেমন যেন একটা নেশা। বাইকার কিংবা মটোট্রাভেলাররা মনে হয় এমনই।

খবরের শিরোনাম আর আবহাওয়ার পুর্বাভাসে যখন ঘুর্ণিঝড় বুলবুলের চর্চা ঠিক তখন শুরু হলো আমাদের যাত্রা। উদ্দেশ্য কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ, বান্দরবানের ডিম পাহাড়, নীলগিরি, চিম্বুক-নিলাচল ভ্রমণ; একদল আবার এগুলো পার হয়ে সাজেকেও করবেন গমন। 

৭ই নভেম্বর, ২০১৯। রাত ১১টা, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে থেকে আমরা রওনা হলাম। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার পার হয়ে একটি পেট্রোল পাম্পের সামনে সবাই কিছুক্ষণের আলোচনা করে সারিবদ্ধভাবে শুরু হলো মূল রাইড। ওভারটেকিং-ওভারস্পিডিং মানা। সারা রাত রাইড করে ৮ই নভেম্বর সকাল ৯টার দিকে পৌঁছলাম কক্সবাজার। শুরুতেই হোটেল বিড়ম্বনা। আগেই একটি হোটেলে জানানো হয়েছিলো, কিন্তু কোনো এক কারণে সেখানে রুম পাওয়া গেলো না। পরে বেশ কয়েকটি হোটেল ঘুরে মিললো একসঙ্গে ৩টি রুম। চট-জলতি কাপড় পাল্টে চিৎপাটাং! কিছুটা সময় ঘুম! এরপর দুপুরের খাবার খেয়েই মেরিন ড্রাইভে, আহ কী সুন্দর রাস্তা। একপাশে পাহাড় আরেক পাশে উত্তাল সাগড়। মেরিন ড্রাইভের পাশে সমুদ্রের পানিতে বাইক রাইডের সাথে ইনানী বিচে কিছুটা সময় কাটানো হল! ততক্ষণে সন্ধ্যা! এবার কক্সবাজার শহরে ফিরে সব বাইক ওয়াশ করে সুগন্ধা বিচের সামনে কোরাল ফ্রাই আর পরটা, ডিনার কমপ্লিট, বেজে গেছে রাত ১১টা। এবার ঘুমোতে হবে দ্রুত, কারণ খুব সকালেই যেতে হবে বহুদূর- পথ দুর্গম, সঙ্গে ঘুর্ণিঝড় বুলবুল কড়া নাড়ছে। জানা গেলো, সকালের দিকে বেশ ঝড়-বৃষ্টি হবে!


৯ই নভেম্বর সকাল ৬টা। ঘুম থেকে উঠে দেখি বৃষ্টি। সিদ্ধান্ত হলো বৃষ্টির মধ্যেই রওনা দেয়ার। নাস্তা শেষ করে, রেইনকোট পড়ে সকাল ৮টায় কক্সবাজার থেকে রওনা হলাম ডিম পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। এই যাত্রায় একদল যাবে (আমি যে দলে/৪জন/মোটরবাইক) ডিম পাহাড়-নীলগিরি-চিম্বুক পাহাড় হয়ে বান্দরবান পর্যন্ত) আরেক দল যাবে (৬জন/ ৪ মোটরবাইক) একই পথে হয়তে খাগড়াছড়ি। উল্লেখ্য- ডিম পাহার, নীলগিরি ও চিম্বুক পাহাড় একই পথে।  

বান্দরবানের রাস্তার প্রথম বাঁকেই বুঝতে পারলাম উঁচু-নিচু’র খেলা শুরু হয়ে গেছে! যত পথ যাচ্ছি ততই বাড়ছে উঁচু-নিচু আর আকাবাঁকা রাস্তা। কখনো ঝুম বৃষ্টি-কখনো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। মনের মধ্যে তখন অনেক উত্তেজনা, অচেনা পথেই যে পূরণ হতে চলেছে অনেক বড় স্বপ্ন। এদিকে, বান্দরবানে ঢোকার পর পরই শুনতে পেলাম বুলবুলের সতর্ক বার্তা; মাইকিং করে জানান দেয়া হচ্ছে সবাইকে নিরাপদে থাকার জন্য। তবুও না শোনার ভান!



আমরা এগিয়ে চললাম বাংলাদেশের “সবচেয়ে উঁচু মোটরেবল রোড” ডিম পাহাড়ের দিকে। ছোট করে বলে নেই, এই রাস্তায় আসতে হলে অবশ্যই বাইকের সার্ভিসিং ভালোমত করিয়ে নিতে হবে, কাগজপত্র ঠিক রাখতে হবে। আর পথে ৩টি চেক পোস্ট আছে, এগুলোতে ভোটার আইডি’র ফটোকপি লাগবে। এই রাস্তা পুরোটাই পাকা, তবে বেশ আকাবাঁকা। কিছু অংশ বেশ খারাপ, আছে খানাখন্দ। আছে গভীর খাদ। ছোট একটা ভুলের জন্য হতে পারে বড় দুর্ঘটনা। আর আমরা যেহেতু বৃষ্টির মধ্যে রাইড করছিলাম, তাই দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে গিয়েছিলো বহুগুনে, তবে দল ছিলো শক্ত, একত্র। একে অপরকে সিগনাল দিয়ে সতর্ক করে আমরা এগিয়ে চলি স্বপ্ন পূরণের দিকে। পাহাড়ি রাস্তায় ঢালুতে নামার সময় আর উঁচুতে ওঠার সময় অনেক সংযমি হতে হবে। মনোযোগ হারানো যাবে না। 

ঘড়ির কাটায় দখন দুপুর দুইটা, কিছুটা ক্লান্তি ভর করেছে। প্রায় ১০০ মিলোমিটার পথ আসতে সময় লেগেছে ৪ঘন্টার মত! এমন সময় বুঝলাম স্বপ্ন হলো সত্য। চলে এসেছি ডিম পাহাড়। তখন বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়া মিলে তৈরি হয়েছিলো ভয়ঙ্কর সুন্দর পরিবেশ। আহ, মনের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেলো। মনে মনে দল, পরিবার আর সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানালাম।

৩টার দিকে ডিম পাহাড় থেকে নীলগিরির দিকে রওনা দিলাম। এবার একদল আগেই চলে গেলো, কারণ তাদের যেতে হবে খাগড়াছড়ি, আরও অনেক পথ। বিকেল সাড়ে ৪ টায় আমরা (৪জন) নীলগিরি পৌঁছলাম। আবহাওয়া খারাপ থাকায় তখন সন্ধ্যা নেমে যায়! এবার শুরু আরেক অভিজ্ঞতা। বৃষ্টির মধ্যে রাতের আঁধারে পাহাড়ি রাস্তায় বাইক রাইড! পিচ্ছিল ঢালু বাঁক গুলোতে ব্রেক করতে হয় খুবই সতর্কতার সাথে, ব্রেক-ক্লাচ না ধরে থ্রটল (পিক আপ) নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে আরও ভালো। যারা চশমা পড়েন, তাদের জন্য বৃষ্টিতে এবং রাতে অনেক কষ্টের, আমারও বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তবে সঙ্গীদের জন্য এ যাত্রা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। অবশেষে চিম্বুক হয়ে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে পৌঁছাই বান্দরবান শহরে। কিছুক্ষণের চেষ্টায় হোটের রুম পেয়ে যাই, এর পর সাদামাটা খেয়ে ১১ টায় ঘুম। তবে সারা দিনের অ্যাক্সাইটম্যান্ট ঘুমোতে দিচ্ছিলো না।

১০ই নভেম্বর, ঢাকা ফেরার দিন। খবরে তখনো বুলবুল। আর বান্দরবানে বৃষ্টি। পরিকল্পনায় ছিলো নীলাচলও। যাবো নাকি যাবো না...?... অবশ্যই যাবো; নীলাচল ঘুরে ঢাকা রওনা করবো আমরা চার জন। নাস্তা করে সকাল ১১ টার দিকে গেলাম নীলাচল, চলছে ঝুমবৃষ্টি- প্রবল বাতাস। তবে নীলাচলে গিয়ে মেঘের সঙ্গে যেন অদ্ভুত বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। সবার এক কথা ‘আবার আসবো’।

দুপুর ২টার দিকে রওনা হলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। ৪টার দিকে পৌঁছলাম চট্টগ্রাম। বুলবুলাতঙ্কে একবার ভাবলাম, চট্টগ্রামে রাতে থেকে যাই, কিন্তু... না... তা আর হলো না। ভরপেট খেয়ে বিকেল ৫টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিলাম। ঠিকঠাক বাসায় ফিরলাম সবাই, স্বপ্নের রাইড শেষ, ঘড়ির কাটায় তখন পৌনে ১২টা।

ডেস্ক
ময়ূখ ইসলাম
ডিবিসি নিউজ
প্রকাশিতঃ ১২ই নভেম্বর, ২০১৯
আপডেটঃ বুধবার, ১১ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সকাল ০৮:১৭


সর্বশেষ

ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণঃ

আরও পড়ুন