• শুক্রবার, ০৭ মে ২০২১
  • রাত ১:০২

ল্যান্ডিংয়ে ঝাঁকুনি; নিরাপদ নাকি পাইলটের অদক্ষতা?

ল্যান্ডিংয়ে ঝাঁকুনি; নিরাপদ নাকি পাইলটের অদক্ষতা?
বিমান অবতরণের সময় ঝাঁকুনি বা মাটিতে ধাক্কা ছাড়া ল্যান্ডিং নাও হতে পারে।

নিরাপদ ল্যান্ডিংয়ের বিষয়ে যাত্রীদের মাঝে প্রায় একটা ভুল ধারণা লক্ষ্য করা যায় আর সেটা হল বিমান যদি ল্যান্ডিংয়ের সময় একটু জোরে মাটিতে ধাক্কা খায় তাহলে পাইলট ভালো না। তবে মজার বিষয় হলো মাটিতে কোনও ধাক্কা ছাড়াই বিমানের ল্যান্ডিংও কিন্তু নিরাপদ নাও হতে পারে। কারণ ধাক্কা ছাড়া ল্যান্ড করতে হলে বিমান যখন রান ওয়ের খুব কাছে আসবে তখন বিমান আকাশে একটু ভাসিয়ে রাখতে হবে এবং একটু সময় নিয়ে আস্তে আস্তে মাটিতে স্পর্শ করাতে হবে। আর এ কাজটি যেকোনো দক্ষ একজন পাইলটের পক্ষে করা খুব সহজ।

কিন্তু, পাইলট প্রশিক্ষণের সময় কখনই এটা শেখানো হয় না যে বিমানকে খুব আস্তে আস্তে মাটি স্পর্শ করাতে গিয়ে ভাসতে-ভাসতে রানওয়ের কিছু অংশ বাদ দিয়ে মাটিতে স্পর্শ করবে। বরং স্টাবিলাইজড অ্যাপ্রচকে খুব গুরুত্ব সহকারে শেখানো হয়। কারণ যেকোনো যাত্রীবাহী বিমানের জন্য ল্যান্ডিংয়ের সময় স্টাবিলাইজড অ্যাপ্রচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ল্যান্ডিংয়ের সময় কোনও বিমান দুর্ঘটনায় পতিত হলে অধিকাংশ সময় অনুসন্ধানে দেখা যায় বিমান দুর্ঘটনার মূল কারণ আনস্টাবিলাইজড অ্যাপ্রচ। আনস্টাবিলাইজড অ্যাপ্রচ বলতে তাহলে আমরা কি বুঝি? খুব গভীরে না গিয়ে যদি সহজভাবে বলা যায় পাইলট বিমানটিকে রানওয়ে থেকে একটা নির্দিষ্ট উচ্চতা এবং দূরত্বে এসে একটা নির্দিষ্ট গতি এবং রানওয়ে সেন্টার লাইন বরাবর একই ট্রাজেক্টরি (ঢাল) ফলো করে বিমানের কন্ট্রোল এবং পাওয়ার লিভার খুব কম অপারেট করে বিমানটিকে মাটিতে স্পর্শ করাতে পারবেন। আর এটা করতে পারলে বিমানটি ৩০ থেকে ৫০ ফুট উচ্চতায় রানওয়ের প্রথম অংশ বা থ্রেশহোল্ড পার হতে পারবে। আর সেটা করতে পারলেই বিমানটি রানওয়ের প্রথম ১০০০ ফুট দূরত্বের মধ্যে মাটিকে স্পর্শ করতে পারবে।

একটু জোরে মাটিকে স্পর্শ করা মানেই খারাপ ল্যান্ডিং নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত পাইলট উপরে বর্ণিত নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলো বজায় রেখে মাটিতে স্পর্শ করবেন। বরং একজন দক্ষ বৈমানিকের কাছ থেকে এটাই কাম্য। কিন্তু সাধারণ মানুষ চান বিমান খুব আস্তে মাটিতে স্পর্শ করুক। যেটা করা একজন পাইলটের পক্ষে খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু তাতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অনেকগুণ বেড়ে যাবে।

পাইলটকে যদি ঝাঁকুনি ছাড়া বিমান মাটিতে স্পর্শ করাতে হয় তাহলে তাকে বিমানকে রানওয়ের সামান্য উপর দিয়ে ভেসে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। যেটা করতে গিয়ে রানওয়ের বড় একটা অংশ পিছনে চলে যেতে পারে। আর যদি সেটা আমাদের দেশের বরিশাল, রাজশাহী এবং সৈয়দপুরের মত কম দৈর্ঘ্যের রানওয়ে হয় তাহলে ল্যান্ডিং এর সময় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। আর এটা জানার পর কোনও যাত্রী নিশ্চয় চাইবে না যে বিমান দুর্ঘটনায় পতিত হোক। বরং সবাই চাইবে নিরাপদে অবতরণ করুক, আর এই নিরাপদে অবতরণ করতে গিয়ে সামান্য ঝাঁকি খেলেও নিরাপত্তার স্বার্থে সেটাকে পাইলটের অযোগ্যতা মনে করবে না।

প্রত্যেক বিমানের ধরন অনুযায়ী সীমাবদ্ধতার বাইরে ঝাঁকি খাওয়ার একটা ডেটা দেওয়া আছে। যেমন সাধারণত যেকোনো যাত্রীবাহী বিমানের ল্যান্ডিং এর সময় যদি ২.৪ জি ('জি' হচ্ছে বিমান মাটিতে অবতরণের সময় তার লম্বিক ত্বরণ) এর বেশি জোরে ধাক্কা খায় তাহলে সেটাকে সাধারণ বলা যাবে না। তবে দীর্ঘদিনের যাত্রীদের অভিযোগে যেটা পাওয়া যায় বিমান ল্যান্ডিংয়ের সময় যদি এই পরিমাপ ১.৫ জি অতিক্রম করে তাহলে যাত্রীরা পাইলটের বিরুদ্ধে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে ল্যান্ডিংয়ের অভিযোগ তোলে। যদিও উপরে উল্লেখিত সীমাবদ্ধতার অনেক নিচে পাইলট বিমানটিকে নিরাপদে মাটিতে অবতরণ করাতে সক্ষম হয়।

আরো একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বিশেষ করে বৃষ্টির মধ্যে ল্যান্ডিং সর্বদা ঝাঁকুনি দিয়ে করলেই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। যেটাকে আমরা বলি পজেটিভ ল্যান্ডিং।

লেখকঃ মোঃ কামরুল ইসলাম (বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত স্কোয়াড্রন লিডার), বর্তমানে নভো এয়ারলাইন্সে ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত।

ডেস্ক
ডিবিসি নিউজ
প্রকাশিতঃ ২৩শে ডিসেম্বর, ২০২০


সর্বশেষ

আরও পড়ুন