• সোমবার, ১৬ মে ২০২২
  • রাত ১০:৪৫

হাড়কাঁপানো শীতের আমেজ পেতে ঘুরে আসুন উত্তরবঙ্গ

হাড়কাঁপানো শীতের আমেজ পেতে ঘুরে আসুন উত্তরবঙ্গ
উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বছরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। ফলে নগরের যান্ত্রিক কোলাহলের বাইরে কুয়াশার চাদরে ঢাকা হাড়কাঁপানো শীতের আমেজ নিতে চাইলে আপনার আদর্শ গন্তব্য হতে পারে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো।

ঢাকায় আজকাল ঠিকমতো শীত পড়ে না। ঢাকা শহরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় নয়-দশ মাসই তীব্র গরম অনুভূত হয়। নভেম্বরে দিকেও ঢাকায় পুরো শীতের আবহ পাওয়া যায় না। ইট-পাথরের জঞ্জালে ভরা এই শহর থেকে শীতের পোশাক গায়ে তুলতে না তুলতেই শীত পালিয়ে যায়। এখন শীতের প্রকৃত অনুভূতি ঢাকা শহরে পাওয়া অসম্ভব। এই নিয়ে আফসোসের শেষ নেই নগরবাসীর। বছর দশেক আগের শীতের কুয়াশা ঢাকা ভোর, মিষ্টি রোদের দুপুর আর লেপ মোড়ানো রাতের কথা মনে করে বিষণ্ণতা ভর করে শহরের মানুষের মনে।

তাই যারা প্রকৃত শীতের আমেজ নিতে চান তাদের জন্য শীতের ছুটি কাটানোর উপযুক্ত জায়গা হতে পারে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো। যেমন: রাজশাহী, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, রংপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও কুড়িগ্রাম। তীব্র শীতের আমেজ ছাড়াও ঐতিহাসিক অনেক গুরুত্ববহ নানা দর্শনীয় স্থান রয়েছে জেলাগুলোতে। চলুন জেনে নেয়া যাক শীতের ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার এই স্থানগুলোয় ভ্রমণের আদ্যোপান্ত।

রাজশাহী: সিল্ক সিটি ট্রেনে চড়ে রাজশাহীতে যাওয়ার পর এর নির্মল বাতাসে শুরুতেই মন ভালো হয়ে যাবে। শীতের সকালে বা পড়ন্ত বিকেলে অবসর সময় কাটানোর জন্য আদর্শ জায়গা হচ্ছে রাজশাহীর পদ্মার পাড়। কুয়াশায় মোড়ানো পূর্ণিমায় পদ্মার পাড় হয়ে উঠে অপার্থিব সৌন্দর্যমন্ডিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস রাজশাহীর আরেক স্নিগ্ধ গন্তব্য।

রাজশাহী শহরে আরও রয়েছে পুঠিয়া রাজবাড়ি, ঐতিহাসিক বাঘা মসজিদ, ইতিহাসসমৃদ্ধ নানা মন্দির। যে সকল জায়গায় গিয়ে প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের অনেক কিছু জানা যায়। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা, হাওয়াখানা প্রভৃতি ভ্রমণকেন্দ্রও রয়েছে শহরে। রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্কের মার্কেটও অনেক পর্যটকের প্রিয় জায়গা।

ঢাকা থেকে রাজশাহী জেলায় যাতায়াত ব্যবস্থা বেশ ভালো। ট্রেনে যেতে চাইলে সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, পদ্মা এক্সপ্রেস, ধূমকেতু এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেসে যাওয়া যাবে। ৩৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথের যাত্রায় ট্রেন ভাড়া পড়বে শ্রেণিভেদে ৩৪০ থেকে ১০২০ টাকা। সময় লাগবে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার কাছাকাছি। ট্রেন ছাড়াও ঢাকা থেকে রাজশাহী যাতায়াতের জন্য বেশ কিছু এসি ও ননএসি বাস সার্ভিস আছে। বাসের ভাড়া পড়বে ৪৫০-১০০০ টাকার মতো।

রাজশাহীতে থাকার জন্য সার্কিট হাউজ, পর্যটন হোটেল-মোটেল ছাড়াও বেশ কিছু ভালো আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে বেশ নিরাপদে পরিবারসহ থাকা যাবে।

কুষ্টিয়া: বাউল ফকির লালন শাহের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়া দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে বেশ বিখ্যাত। কুষ্টিয়ার টাটকা খেজুরের রস দিয়ে শীতের সকাল শুরু করা যায়। ঘুরে বেড়ানো যায় লালন ফকিরের মাজার, রবীন্দ্রনাথ ঠাঁকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর, ঠাঁকুর লজ, মীর মোশারফ হোসেনের বাস্তুভিটা, লালন শাহ সেতু, ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ, জিউর মন্দিরের মতো ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলোতে। এছাড়াও কুষ্টিয়া ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ঘুরে বেড়ানো যায়।

ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া রেলপথে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও চিত্রা এক্সপ্রেসে যাওয়া যাবে। সিট অনুযায়ী ভাড়া পড়বে ৩০০ থেকে ১০৮০ টাকা পর্যন্ত। সময় লাগবে ছয় ঘণ্টার কাছাকাছি। কুষ্টিয়ায় যাতায়াতের জন্য এসি ও ননএসি বাসও রয়েছে। ভাড়া পড়বে ৬০০ থেকে ১২০০ টাকার মতো।

কুষ্টিয়া শহরে থাকার জন্য রয়েছে সরকারি, বেসরকারি বেশ কিছু নিরাপদ ও ভালো মানে হোটেলের ব্যবস্থা।

পঞ্চগড়: দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড় ‌‌'হিমালয় কন্যা নামে' পরিচিত। নাম শুনেই নিশ্চই বুঝা যায় হিমালয় কন্যায় হিমের প্রভাব! সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে এখন শীতে ভ্রমণপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া।

প্রতি বছর নভেম্বরের শুরুতে পর্যটকেরা সেখানে পাড়ি জমান সোনার পাহাড় দেখার জন্যে। আবহাওয়া ও আকাশের অবস্থা অনুকূলে থাকলে তেতুলিয়া থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভারতের কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলে মহানন্দার পাড়ে থেকেই। এছাড়াও বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, সমতলে বিস্তৃত চা বাগান, গোলকধাম মন্দির, বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির, বার আউলিয়া মাজার, ভিতরগড় দুর্গ নগরী, মহারাজার দীঘি, মির্জাপুর শাহী মসজিদসহ নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা পঞ্চগড়ে রয়েছে।

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে আছে বাংলাদেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর। ব্যতিক্রমী এই জাদুঘরে বিভিন্ন বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের নানা বয়সী পাথর, বিভিন্ন আদিবাসীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, পোড়ামাটির নানা মূর্তিসহ নানা অভিনব নিদর্শনের দেকা মেলে।

ট্রেন বা বাস দুই পথেই পঞ্চগড় ভ্রমণের সুব্যবস্থা রয়েছে। পঞ্চগড় একপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস ও দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেনে সিট ভেদে টিকেটের দাম পড়বে ৩৬৫ থেকে ১২৫৪ টাকা পর্যন্ত। বাস ভাড়া পড়বে এসি-ননএসি সিট ভেদে ৫৫০-১৬০০ টাকা পর্যন্ত।

পঞ্চগড়ে থাকার জন্য তেতুলিয়ার ডাকবাংলো বেশ জনপ্রিয় জায়গা। মহানন্দার কোলেঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক ডাকবাংলোর পাশেই রয়েছে পিকনিক স্পট। তাই পরিবার বা বন্ধুবান্ধবসহ থাকার জন্য এত মনোরম জায়গা এই ডাকবাংলো। এছাড়াও পঞ্চগড় সার্কিট হাউজসহ বিভিন্ন সরকারি রেস্ট হাউজ আছে পঞ্চগড় শহরেই। বেসরকারি বিভিন্ন হোটেলেও থাকার সুব্যবস্থা আছে।

দিনাজপুর: শীতের হাড়কাঁপানো অনুভূতি পেতে প্রাচীন শহর দিনাজপুর হতে পারে আকর্ষণীয় স্থান। স্থাপত্যশৈলীর বিচিত্র নিদর্শন দেখা যায় দিনাজপুরের নানা বিখ্যাত স্থাপনায়। এর মধ্যে দিনাজপুর রাজবাড়ী, কান্তজির মন্দির, নয়াবাদ মসজিদ, দীপশিখা আনন্দালয় ও মেটি স্কুল অন্যতম। এছাড়াও রামসাগর দীঘি, সুখসাগর ইকোপার্ক, স্বপ্নপুরী পিকনিক স্পট, লিচুবাগানের মতো ভ্রমণকেন্দ্রও রয়েছে দিনাজপুরে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও ঘুরে আসার সুন্দর জায়গা।

ঢাকা থেকে দিনাজপুর যাতায়াতের জন্য একতা এক্সপ্রেস ও দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেন রয়েছে। সিট অনুযায়ী ট্রেন ভ্রমণে ভাড়া লাগে ৩৯০ থেকে ১৩৯০ টাকা পর্যন্ত। ঢাকা টু দিনাজপুর যাতায়াতে সময় লাগে ৮ ঘণ্টার মতো।

এছাড়াও ঢাকা-দিনাজপুর যাতায়াতের জন্য রয়েছে এসি-ননএসি বাস। বাসভাড়া ৫৫০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত।

দিনাজপুর শহরে থাকার জন্য রয়েছে সার্কিট হাউজ, পর্যটন মোটেল, রামসাগর জাতীয় উদ্যান রেস্টহাউজ, জেলা পরিষদের ডাকবাংলোসহ নানা সরকারি রেস্টহাউজ ও বেসরকারি হোটেল।

রংপুর: উত্তরবঙ্গের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান রংপুরের শীত প্রতিবছর নতুন রেকর্ড গড়ে যায়। শীতে ভাওয়াইয়া গানের দেশ রংপুরে বেড়াতে গিয়ে দেবী চৌধুরানীর রাজবাড়ি, পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়ার বাড়ি, লালদিঘি নয় গম্বুজ মসজিদ, তাজহাট জমিদার বাড়ি, প্রয়াস সেনা বিনোদন পার্ক, ভিন্নজগত পার্কসহ নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ানো যায়।

রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনে করে ঢাকা থেকে রংপুরে যাতায়াত করা যায়। সিট অনুযায়ী ভাড়া ৫০৫ থেকে ১১৬২ টাকা। ট্রেনে পৌঁছাতে সময় লাগে ১০ ঘণ্টার মতো। বিভিন্ন এসি ও ননএসি সার্ভিসে বাসভাড়া ৭০০ থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত। থাকার জন্য রংপুরে পর্যটন মোটেল, জেলা পরিষদ ডাকবাংলো ছাড়াও রয়েছে নানা সরকারি রেস্টহাউজ। এছাড়া বেসরকারি বিভিন্ন হোটেলেও ভালো থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

ঠাকুরগাঁও: শীতকালে প্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত ঠাকুরগাঁও এর শান্ত পরিবেশ যে কারো মনে এনে দেবে প্রশান্তির ছোঁয়া। জগদল রাজবাড়ি, হরিপুর রাজবাড়ি, জামালপুর জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ, বালিয়া মসজিদ, হরিণমারী শিব মন্দির, রাজা টংকনাথের রাজবাড়িসহ নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন ঠাকুরগাঁও জেলার অন্যতম আকর্ষণ।

রেলপথে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস ও দ্রুতযান এক্সপ্রেসে করে ঠাকুরগাঁও যাতায়াত করা যায়। সিট ভেদে ভাড়া পড়বে ৫২০- ১৭৮৩ টাকা পর্যন্ত। বাসে করে গেলে ভাড়া ননএসি-এসি ভেদে ভাড়া পড়বে ৬০০-১৪০০ টাকা পর্যন্ত। সার্কিট হাউজ, সরকারি রেস্টহাউজ সহ নানা বেসরকারি হোটেলের সুব্যবস্থা আছে থাকার জন্য।

কুড়িগ্রাম: শীতে কাঁপতে কাঁপতে ঘুরে বেড়াতে চাইলে কুড়িগ্রাম বেশ রোমাঞ্চকর গন্তব্য। নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি, চান্দামারী মসজিদ, ভেতরবন্দ জমিদার বাড়ি, উলিপুর মুন্সিবাড়ী, বঙ্গ সোনাহাট ব্রিজ কুড়িগ্রামের ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তঘেষা নদী ধরলার ওপর নির্মিত ধরলা ব্রিজ কুড়িগ্রামে সময় কাটানোর জনপ্রিয় গন্তব্য।

কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ট্রেনে সিট ভেদে ৫১০-১৮০৪ টাকা খরচ করে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম যাতায়াত করা যাবে। বাসে যেতে খরচ পড়বে এসি-ননএসি ভেদে ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত।

সরকারি সার্কিট হাউজ ছাড়াও কুড়িগ্রামে কিছু বেসরকারি হোটেল রয়েছে পর্যটকদের জন্য।

উত্তরবঙ্গের এই নির্দিষ্ট জেলাগুলো ছাড়াও শীতের আমেজ নিতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলসহ সিলেটের বেশ কিছু জায়গা ভ্রমণপিপাসুদের প্রিয় স্থান। ছুটি কাটাতে গিয়ে এই জায়গাগুলোর ঐতিহ্য ও লোকজ জীবন সম্পর্কে গভীরভাবে জানা যায়। হারিয়ে যাওয়া শীতের আমেজ ফিরিয়ে আনতে নগর জীবন থেকে কিছুদিনের ছুটি নিয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা গুলো ঘুরে আসতে পারেন বছরের শেষেই।

ডেস্ক
ডিবিসি নিউজ
প্রকাশিতঃ ২৫শে নভেম্বর, ২০২১


সর্বশেষ

আরও পড়ুন