বাংলাদেশ, সারা বাংলা
ধুমধাম করে গৃহকর্মীর বিয়ে দিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন গাইবান্ধার দম্পতি

দারিদ্র্য, নির্যাতন আর চরম অনিশ্চয়তায় ঘেরা এক শিশুর জীবন। সেখান থেকে ভালোবাসা, শিক্ষা ও মানবিকতার ছোঁয়ায় নতুন জীবনের স্বপ্নপূরণ। দিনাজপুরের মেয়ে পূর্ণিমা আক্তার সুমির জীবনকাহিনি যেন বাস্তব জীবনের এক অনন্য অনুপ্রেরণার গল্প।
সুমি দিনাজপুরের কৃষিশ্রমিক মকবুল হোসেন ও সাহারা বানুর সন্তান। অভাবের সংসারে অনেক সন্তান থাকায় তাদের ভরণ-পোষণ করতেই হিমশিম খেতে হতো বাবা-মাকে। সেই অসহায় পরিস্থিতিতে ছোট্ট সুমিকে বগুড়ার একটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজে পাঠানো হয়।
কিন্তু সেখানে সুখের বদলে তার ভাগ্যে জোটে নিষ্ঠুর নির্যাতন। নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে থাকে শিশুটি। একপর্যায়ে সুমির মা-বাবা তৎকালীন নবাবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইমতিয়াজ সজীবের শরণাপন্ন হন। বিষয়টি জানার পর তিনি দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে সুমিকে উদ্ধার করেন এবং নিজের বড় ভাই ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আনোয়ার কবির সুজনের পরিবারের কাছে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন।
সেখান থেকেই বদলে যায় সুমির জীবনের গল্প। আনোয়ার কবির সুজন ও তার পরিবারের সদস্যরা সুমিকে আপন সন্তানের মতো আগলে রাখেন। গত ১৩ বছর ধরে তারা শুধু আশ্রয়ই দেননি, পরম আদর-স্নেহে তাকে বড় করে তুলেছেন, দিয়েছেন লেখাপড়ার সুযোগ এবং জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ দেখিয়েছেন।
অবশেষে সেই সুমির জীবনে এলো নতুন এক অধ্যায়। গাইবান্ধার একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে রংপুরের ছেলে তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
জমকালো এই বিবাহ অনুষ্ঠানে শিক্ষক, চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা ও সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিয়েতে উপস্থিত অতিথিরা বলেন, মানবিকতার এমন দৃষ্টান্ত বর্তমান সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় বার্তা। জন্মদাতা বাবা-মায়ের অসহায়ত্বের কারণে যে শিশুর জীবন একসময় অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছিল, অন্য একটি পরিবার তাকে আপন সন্তানের মতো লালন-পালন করে আজ সম্মানের সঙ্গে বিদায় দিল-এটি সত্যিই প্রশংসনীয়।
নবদম্পতি পূর্ণিমা আক্তার সুমি ও তৌহিদুল ইসলাম তাদের নতুন জীবনের শুরুতে সবার কাছে দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করেছেন।
এদিকে পালিত বাবা-মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আনোয়ার কবির সুজন ও তার পরিবার শুধু বিয়ের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; উপহার হিসেবে টেলিভিশন, ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় সমস্ত গৃহস্থালি সামগ্রী দিয়ে নতুন সংসার সাজিয়ে দিয়েছেন।
আবেগঘন কণ্ঠে তারা বলেন, বিয়ে দিয়েই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। সুমি চিরকাল আমাদের মেয়েই থাকবে। আজীবন আমরা এই দম্পতির পাশে থাকব।
মানবিকতার এমন উজ্জ্বল ও দৃষ্টান্তমূলক কাজের জন্য প্রশংসায় ভাসছেন সুমির পালিত বাবা-মা। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সমাজে যদি এমন হৃদয়বান মানুষ আরও এগিয়ে আসেন, তবে কোনো অসহায় শিশুই আর অবহেলিত থাকবে না; ভালোবাসা, শিক্ষা ও মানবিকতার স্পর্শে বদলে যাবে তাদের ভাগ্য।
ডিবিসি/এসএফএল