ডিবিসি নিউজdbcnews.tv

সারা বাংলা

পঞ্চগড় থেকে ট্রাকে ট্রাকে বাঁশ যাচ্ছে সারা দেশে, বাড়ছে বাণিজ্যিক চাষ

পঞ্চগড় থেকে ট্রাকে ট্রাকে বাঁশ যাচ্ছে সারা দেশে, বাড়ছে বাণিজ্যিক চাষ

সারা বাংলা

পঞ্চগড় থেকে ট্রাকে ট্রাকে বাঁশ যাচ্ছে সারা দেশে, বাড়ছে বাণিজ্যিক চাষ

পঞ্চগড় প্রতিনিধি

ডিবিসি নিউজ

শুক্রবার ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:১৩:২২ পূর্বাহ্ন

উত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে ট্রাকে ট্রাকে বাঁশ যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। জেলার বিভিন্ন এলাকার বাঁশঝাড় থেকে সংগ্রহ করা এসব বাঁশ সরবরাহ হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহীসহ দেশের বড় বড় শহরের বাজারে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঁশ সরবরাহ করে আয় করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বাড়তি পরিচর্যার প্রয়োজন কম এবং তুলনামূলক কম সময়ে বাঁশ বিক্রির উপযোগী হওয়ায় এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ির আঙিনা, জমির আইল, রাস্তার ধারে কিংবা পতিত জায়গায় গড়ে উঠেছে বাঁশঝাড়। এসব বাঁশঝাড়ে নানা জাতের বাঁশ চাষ করছেন কৃষকরা। বাঁশ চাষে আলাদা করে খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। একবার ঝাড় তৈরি হলে পুরোনো বাঁশের গোড়া থেকেই নতুন কঞ্চি বের হয়। সাধারণত তিন থেকে চার বছরের মধ্যে একটি বাঁশ পরিপক্ব হয়ে ওঠে এবং তা বিক্রির উপযোগী হয়।


স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঁশঝাড় তৈরির পর নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচর্যা ছাড়া বড় ধরনের খরচ হয় না। ফলে বাড়ির আশপাশের অনাবাদি জায়গা কিংবা জমির আইল কাজে লাগিয়ে বাঁশ উৎপাদন করছেন অনেকে। নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত বাঁশ বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করছেন তারা।


স্থানীয় বাজারে আকার ও মানভেদে প্রতিটি বাঁশ প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে জাত, আকার, বয়স ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী দাম কমবেশি হয়। কৃষকের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তা কেটে, বাছাই করে বিভিন্ন আড়ত ও সরবরাহকারীর কাছে পাঠান। পরে ট্রাকে করে এসব বাঁশ চলে যায় দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে।


পঞ্চগড় সদর উপজেলার তালমা এলাকার আব্দুল কাদের নামে একজন বাঁশচাষি জানান, বাঁশ চাষে অন্য অনেক ফসলের মতো প্রতিবছর নতুন করে জমি প্রস্তুত করতে হয় না। একবার বাঁশঝাড় তৈরি হলে সেখান থেকে নিয়মিত বাঁশ পাওয়া যায়। নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বাঁশ বিক্রি করে বাড়তি আয় করা যায়। চাহিদা আরও বাড়লে বাঁশের ঝাড় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।


পঞ্চগড়ের স্থানীয় বাঁশ ব্যবসায়ীরা জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা বাঁশ সংগ্রহ করেন। এরপর আকার ও মান অনুযায়ী বাঁশ বাছাই করে বড় ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের কাছে পাঠানো হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাঁশের চাহিদা আসায় নিয়মিত পরিবহনের মাধ্যমে তা পাঠাতে হয়।


পঞ্চগড়ের টুনিরহাট এলাকার স্থানীয় বাঁশ ব্যবসায়ী মোস্তফা বলেন, পঞ্চগড়ের বাঁশের চাহিদা শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সময় ঢাকাসহ দেশের অন্য জেলা থেকে চাহিদা আসে। কৃষকের কাছ থেকে বাঁশ কিনে সংগ্রহ ও বাছাই করার পর বড় ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করা হয়। পরে সেগুলো ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়।


গ্রামীণ জীবনে বাঁশের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। ঘরবাড়ি ও বেড়া তৈরির পাশাপাশি কৃষিকাজে মাচা তৈরি, নির্মাণকাজ, অস্থায়ী স্থাপনা, আসবাবপত্রসহ নানা কাজে বাঁশ ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শৌখিন ও ব্যবহারিক সামগ্রীও তৈরি হচ্ছে। ফলে বাঁশের বাজার শুধু গ্রামকেন্দ্রিক নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এর চাহিদা রয়েছে।


পঞ্চগড়ের জালাসী এলাকার নয়ন তানভীরুল বারী বলেন, বাঁশের ব্যবহার অনেক ধরনের। আগে মূলত ঘরবাড়ি, বেড়া কিংবা কৃষিকাজে বেশি ব্যবহার হলেও এখন বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বাঁশ প্রক্রিয়াজাত করে আসবাবপত্র ও বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা গেলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আরও ভালো দাম পেতে পারেন।


পঞ্চগড় থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাঁশ সরবরাহের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন কৃষক, স্থানীয় বাঁশ ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। ফলে একটি বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটা শুরু করে দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েকটি ধাপে তৈরি হচ্ছে আয়ের সুযোগ।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পঞ্চগড়ে বাঁশের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে আরও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে এটি কৃষকের জন্য বাড়তি আয়ের একটি খাত হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে বাঁশ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত ও বাঁশজাত পণ্য তৈরির ব্যবস্থা করা গেলে কাঁচা বাঁশের পাশাপাশি মূল্য সংযোজিত পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে। এতে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাঁশের তৈরি আসবাবপত্র, ঝুড়ি, ডালা, মাচা ও অন্যান্য ব্যবহারিক সামগ্রী তৈরির ছোট শিল্প গড়ে উঠলে বাঁশের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পঞ্চগড় বাঁশ চাষের সম্ভাবনাময় একটি জেলা। পরিকল্পিতভাবে বাঁশের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়ানো সম্ভব। স্থানীয়ভাবে বাঁশজাত পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলে উৎপাদনকারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আরও বেশি সুবিধা পেতে পারেন।


ডিবিসি/এসভিএন
 

আরও পড়ুন