খেলাধুলা, ক্রিকেট
এক কিডনি নিয়েই খেলেছেন বাংলাদেশের হয়ে, জানলেন ২১ বছর পর

৪৫ বছরের জীবনের পুরোটাই ক্রিকেটময়। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে শুরু করে ঘরোয়া ক্লাব ক্রিকেট, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, ‘এ’ দল-এরপর বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলেছেন তিনটি টেস্ট আর তিনটি ওয়ানডে। যাঁর কথা বলা হচ্ছে, শুনলে অবাক হবেন; বাংলাদেশের এই ক্রিকেটারটি নিজের অজান্তেই ক্রিকেটে জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছেন শরীরে বড় এক ঘাটতি নিয়ে।
বলা হচ্ছে ২০০২ সালে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা জাতীয় দলের সাবেক অফ স্পিনার ফাহিম মুনতাসিরের কথা। জন্ম থেকেই তাঁর শরীরে একটি কিডনি কম। অর্থাৎ ফাহিম জন্মেছেন এবং বেঁচে আছেন একটি কিডনি নিয়ে। সেটিও তিনি জানতে পারেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বশেষ ম্যাচ খেলে ফেলার ২১ বছর পর, নিজের ৪৩ বছর বয়সে পৌঁছে।
ফাহিম মুনতাসিরের খেলোয়াড়ি জীবন
বাংলাদেশের ক্রিকেটে ফাহিম মুনতাসির ‘সুমিত’ নামেই বেশি পরিচিত। ১৯৯৮ সালের অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপে প্লেট চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ যুব দলের সদস্য ছিলেন, পরের বছর পেয়েছিলেন যুব দলের নেতৃত্বও।
১৯৯৮ সালের মার্চেই বিসিবি একাদশের হয়ে ভারত সফরে লিস্ট ‘এ’ অভিষেক হয় ফাহিম মুনতাসিরের। পরের বছর ঢাকায় ইয়ান বিশপের নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের বিপক্ষে হয় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক। স্বাধীনতার পর ওটাই ছিল বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম প্রথম শ্রেণির ম্যাচ, যেটির প্রথম ইনিংসে ফাহিম ২৬ ওভার বোলিং করে ১১৬ রানে নিয়েছিলেন ৪ উইকেট।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ২০০১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে। ওই সিরিজেই আরেকটি ওয়ানডে খেলার পর ফাহিম তাঁর তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে খেলেন পরের বছর সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে।
বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে খেলা না হলেও ২০০০ সালের নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে সেই টেস্টের স্কোয়াডে ছিলেন ফাহিম মুনতাসির। তাঁর টেস্ট অভিষেক ২০০২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে। জাতীয় দলে আসার আগে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে গেছেন পাকিস্তান সফরে।
৩৭টি প্রথম শ্রেণির ও ৩৩টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলা ফাহিম লেভেল–২ কোচিং কোর্স করা একজন কোচ। ঘরোয়া ক্রিকেটে কোচিং করিয়েছেন মোহামেডানের মতো বড় ক্লাবকে, একসময় নিয়মিত খেলেছেনও এই ক্লাবের হয়ে। দায়িত্ব পালন করেছেন ম্যানেজার হিসেবে, কাজ করেছেন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে আসা বিভিন্ন বিদেশি দলের লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবেও।
কীভাবে জানলেন শরীরে একটি কিডনি নেই
২০২৩ সালে ফাহিম ভারতের দিল্লিতে গিয়েছিলেন শারীরিক পরীক্ষা করাতে। তেমন কোনো সমস্যা ছিল না, নিয়মিত পরীক্ষা করানোই ছিল উদ্দেশ্য। ওই সময় পেটের আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষার সময়ই চিকিৎসক প্রথম সন্দেহ প্রকাশ করেন যে তাঁর বাঁ পাশে হয়তো কোনো কিডনি নেই।
সেই সময়ের কথা মনে করে এই প্রতিবেদককে ফাহিম বলেন, ‘আলট্রাসনো করার সময় ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, আমার কখনো কোনো অস্ত্রোপচার হয়েছে কি না। আমি বললাম, হয়নি। উনি তখন সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, আমার কিডনি সম্ভবত জন্মগতভাবেই একটি, ডান দিকে। বাঁ দিকেরটা নেই। পরে রিপোর্টেও তাই আসে।’
তবে দিল্লির চিকিৎসক তাঁকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, এক কিডনি নিয়ে জন্ম নেওয়াটা অস্বাভাবিক হলেও এমন যে ঘটে না, তা নয়। এমন অনেকেই আছেন, যারা এক কিডনি নিয়েই সুস্থ জীবন কাটিয়েছেন, কাটাচ্ছেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যে কিডনিটি তাঁর আছে, সেটি যেন সুস্থ থাকে।
কিন্তু তত দিনে ফাহিমের একমাত্র কিডনিতেও বাসা বেঁধেছে জরা, রক্তে কিডনির সুস্থতার পরিমাপক ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যাচ্ছিল স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে। ফাহিম ভারত থেকে দেশে ফেরেন চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র আর শরীরে লুকিয়ে থাকা অজানা এক সত্য জেনে।
ডিবিসি/ আরএফই